মাদকাসক্তি যেভাবে মানসিক রোগে পরিণত হয়

মাদকাসক্তি রোগটি বেশ জটিল। তবে ধৈর্য সহকারে যত্নশীল চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগটি সারিয়ে তোলা সম্ভব। সামাজিক ভাবে মাদকাসক্তির চিকিৎসা স্বাভাবিকীকরণ এর মাধ্যমে অনেক রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন। আসুন এই রোগটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাক।

মানব সভ্যতার একদম গোড়া থেকে মাদক এর ব্যবহার এর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় ২০ কোটি বছর পুরোনো মানুষের পুরাকৃত্তিতে সাইকোট্রপিক গাছের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটুকু পরিষ্কার যে মানুষ ও মাদকের সম্পর্ক প্রায় কোটি বছরের পুরোনো।

মাদক হলো এমন দ্রব্য যা গ্রহণ করলে মানুষের শরীরে নানারকম সুখানুভূতি সৃষ্টি হয়। মাদক গ্রহণ করা অনেকটা হলো নিজের শরীরকে হ্যাক  করে আনন্দ অনুভূতি পাওয়া, যার পার্শ-প্রতিক্রিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভয়াবহ হয়ে থাকে। 

মাদকাসক্তি এবং মাদক সম্পর্কিত একটি রোগ “সাবস্টেন্স এবিউজ ডিজঅর্ডার” আমাদের সমাজে বরাবরই বেশ নিচু চোখে দেখা হয়। কিন্ত এটি যে একটি মানসিক ব্যাধি, সে কথা কেউ বুঝতে চেষ্টা করেন না। আসুন মাদক কেন শরীরের জন্য ক্ষতিকর তা আরো সূক্ষভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

মাদক কেন ক্ষতিকর?

মানুষের আনন্দ বা সুখ পাওয়ার ক্ষুধা অতি আদিম ও সার্বজনীন। আমরা আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম, জীবিকা, সম্পর্ক প্রায় অনেক কিছুই সুখে থাকবার জন্য করি। ভালো খাবার খেলে আমাদের আনন্দ হয়, পছন্দের মানুষের সাথে কথা বললে আমাদের আনন্দ হয়, ভ্রমণে আমরা আনন্দ পাই। কিন্তু আসলে আনন্দটা কি! আনন্দ কেন ও কিভাবে হয়?

আনন্দ বা সুখ আসলে কিছু হরমোন ও বায়োক্যামিক্যাল যা আমাদের মস্তিস্কে ক্ষরণ হলে আমাদের সুখানুভূতি হয়। এই হরমোন গুলোর মধ্যে Serotonin, Dopamine, Endorphins, Oxytocin অন্যতম। একেকটি হরমন একেক রকম সুখানুভূতির সৃষ্টি করে এবং একেক ধরণের কার্যাবলির মাধ্যমে ক্ষরণ হয়। 

যেমন ধরুন কোন কাজ করে তার ভালো ফল পেলে ডোপামিন ক্ষরণ হয়, সেরেটনিন আপনার মুডকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ইত্যাদি। এসব বায়ো-ক্যামিক্যাল গুলো আমাদের দেহে এমন ভাবে ডিজাইন করা যা আমাদের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 

এখন আসুন, মাদক ব্যাবহার করে যদি আপনি মস্তিস্কের ওই সুখি হরমোন গুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলতে পারেন, তবে আপনি বিনা কষ্টে প্রচন্ড আনন্দ লাভ করবেন। শুধু হরমোন ক্ষরণই নয়, বিভিন্ন মাদক বিভিন্ন উপায়ে মস্তিস্কের স্বভাবিক সিগনালিং ব্যাহত করে মানুষকে এক অন্য দুনিয়ার দেখা মেলায়, যেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তি আনন্দ অনুভূতির চুড়ায় অবস্থান করে।

তবে মাদকের খারাপটা কি? 

আনন্দ ও সুখে থাকা তো  খারাপ নয়। সমস্যা টা হলো আমাদের শরীরের হরমোন গুলো বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য সংরক্ষিত। একটি স্বাভাবিক দিনে ডোপামিন এর নিয়মিত ক্ষরণের মাধ্যমে আপনি আপনার সারা দিন আপনার কাজে উৎসাহী থাকতে পারেন। কিন্তু মাদকের প্রভাবে যদি হরমোনটুকু সাময়িক আনন্দের জন্য ক্ষয় করে ফেলেন, আপনার জন্য পড়ে শুধু বিষাদময় সময় পড়ে থাকবে, কোন কাজে মন বসবে না, অস্থির বোধ করবেন। আপনার মনে হবে আপনার আরো ড্রাগ চাই। কিন্তু দিনে দিনে ড্রাগের পরিমাণ বাড়ালেও সুখানুভূতি জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকবে। মানব শরীরকে যেকোন রূপে ম্যানুপুলেট করাই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। 

আমাদের মস্তিস্ক সবসময় উক্ত হ্যাপি হরমোন গুলো পেতে চায়। আমরা না জানলেএ আমরা সেই কাজ গুলোই করি যাতে মস্তিস্কে ওই হরমোন গুলো নিঃসৃত হয়। মাদক গ্রহণে খুব সহজেই বিপুল পরিমাণ আনন্দের হরমোন নিঃসৃত হয়। আমাদের মস্তিস্ক বুঝতে চায় না কোন উপায়ে আনন্দটুকু পাওয়া গেলো, মস্তিস্ক শুধু জানে তার আবার সেরকম হরমোনাল রাশ চাই। ঠিক এই অবস্থাটাই মাদকাসক্তির সৃষ্টি করে। 

মাদক গ্রহণ করা মানেই কি মাদকাসক্ত?

মাদক গ্রহণ করা মাত্রই মাদকাসক্ত নয়। যখন মাদক সেবন আসক্তিতে রূপ নেবে ও মাদক ছাড়া হতাশা, অস্বস্তি, অস্থিরতা ও বিভিন্ন রকম শারিরীক ও মানসিক সমস্যা তৈরি করে সেই অবস্থাকেই মাদকাসক্তি বলা হবে। যদিও সবাই আসক্ত হয় না, তবে একটা বড় সংখ্যার মানুষ মাদক গ্রহণ মাত্রই মাদকে আসক্ত হবার ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে কম মানসিক শক্তি সম্পন্ন মানুষের জন্য মাদক বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

সাবস্টেন্স এবিউজ ডিসঅর্ডার ও মাদকাসক্তি

সাবস্টেন্স এবিউজ ডিসঅর্ডার ও মাদকাসক্তির যদিও একই অর্থে ব্যাবহার হয়, এদের কিছু সূক্ষ পার্থক্য রয়েছে।

  • মাদকাসক্তি শব্দটিতে কোন মাদকের উপর আসক্তিকে নির্দেশ করে।

  • অন্যদিকে সাবস্টেন্স এবিউজ ডিসঅর্ডার মূলত আসক্তির কারণে হওয়া শারিরীক ও মানসিক সমস্যা সহ পুরো রোগটিকে নির্দেশ করে। Substance abuse disorder প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করালে কার্যকরী ভাবে সারিয়ে তোলা যায়।

কোন দ্রব্যগুলোকে মাদক বলা হয়?

মাদক ব্যবহারে মানুষের সৃজনশীলতার জুরি নেই। নানাবিধ ঔষধ, হার্ব, ইনহ্যালেন্টস ইত্যাদি মাদক হিসেবে গ্রহণ করার প্রচলন আছে। আন্তর্জার্তিক মাদক সংস্থ্যা গুলোর মতে মাদক দ্রব্যকে নিন্মক্ত ভাগে ভাগ করা যায়-

  • মদ

  • ক্যাফেইন

  • গাঁজাজাতীয় দ্রব্য

  • হ্যাল্যুসিনোজেনস (যেমন- এলএসডি)

  • ইনহ্যাল্যান্টস (যেগুলো শ্বাসের সাথে গ্রহণ করা হয়)

  • আফিম জাতীয় দ্রব্য

  • উত্তেজনা প্রশমনকারী দ্রব্য (ঘুমের ওষুধ) 

  • হিপনোটিকস বা সম্মোহক পদার্থ

  • উদ্বেগ প্রশমক ঔষধ 

  • স্টিম্যুলেন্টস বা স্নায়ু উত্তেজক দ্রব্য অ্যামফিটামিন জাতীয় দ্রব্য (যেমন- কোকেইন) ও

  • বিভিন্ন তামাক জাতীয় দ্রব্য।

উল্লেখ্য, ক্যাফেইনে মাদকতা থাকলেও এটিকে সাবস্টেন্স এবিউজ ডিসঅর্ডারের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না কারণ এটি ক্ষতিকর নয়।

মাদকাসক্তির চিকিৎসা

প্রত্যেক ধরণের মাদক এর প্রভাব আলাদা ও তাদের আসক্তির ধরণও আলাদা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, প্রত্যেক মাদক মানুষভেদে আলাদা আলাদা প্রাভাব রাখতে পারে ও আসক্তির ধরণও বদলাতে পারে। তাহলে কল্পনা করুন মাদকাসক্তির চিকিৎসা কতটা জটিল হতে পারে!

তবে ভয় পাবার কারণ নেই। সঠিক চিকিৎসায়, পরিবার ও বন্ধুদের সহোযোগীতায় একজন মাদকাসক্ত সম্পুর্ণ রূপে সেরে উঠে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। 

যদিও মাদকাসক্তির চিকিৎসা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নেওয়ার কয়েক মাস থেকে বছরের ভেতর আবার মাদক গ্রহণ শুরু করার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই এই বিষয়টিতে চিকিৎসাপ্রাপ্ত মাদকাসক্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সতর্ক থাকা উচিৎ।

কিছু মাদক যেমন এলকোহল ও নিকোটিন এর কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ মাদকের ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তির যে উপসর্গ গুলো দেখা যায় সেগুলোকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

মাদকাসক্ত ব্যাক্তির চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে মানসিক চিকিৎসা। একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞ শুধু কথা বলে একজন মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে মাদক পরিহার করতে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে পারেন। 

তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রিহ্যাব সেন্টার চালু রয়েছে। রিহ্যাব সেন্টারে আসক্ত ব্যক্তিকে মাদকের থেকে দূরে রেখে বিভিন্ন সাইকোথেরাপির মাধ্যমে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। 

তবে মনে রাখতে হবে যে, মাদকাসক্তির চিকিৎসা অত্যান্ত দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে তাই ধৈর্য ও যত্নসহকারে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই।

কোন ডাক্তার দেখাবেন?

মাদকাসক্ত ব্যক্তির মাদকের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। সেই সাথে অসংলগ্ন আচরণ এ ব্যবহারে পরিবর্তন থেকে তার পরিবারের মানুষই সমস্যাটি সবার প্রথমে বুঝতে পারেন। কিন্তু সামাজিক কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়, ও বিভিন্ন ভাবে সমস্যাটি সমাধান করার চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসা করানো হলে সহজেই মাদকাসক্তি সেরে ওঠার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একজন সাইকোলোজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্ট মাদকাসক্তির সঠিক চিকিৎসা করতে পারেন। নিউরোলোজিস্ট ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও এক্ষেত্রে কার্যকরী হয়ে থাকে। 

শেষ কথা

একটি সমাজকে ধ্বংস করতে মাদকে সহজলভ্যতাই যথেষ্ট, আর সে দিক থেকে আমাদের দেশ প্রচন্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আজানা বিষয়ে মানুষের কৈতুহলের সীমা নেই, তাই মাদককের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। আসুন মাদকাসক্ত ব্যক্তির উপর সহানুভূতিশীল হই, মাদকাসক্ত নয় মাদককে ঘৃণা করি।

Default user image

দিগ্বিজয় আজাদ, লেখক, আস্থা লাইফ

আমি শিল্প সাহিত্যের লোক, একই সাথে বিজ্ঞানের কৌতুহলী ছাত্র। লিখালিখি আঁকাআঁকি করতে ভালোবাসি, পড়ালেখা করছি মাইক্রোবায়োলোজি নিয়ে। আস্থা ব্লগে কাজ করতে পেরে চরিত্রের দুটো দিকই যেন সমানভাবে সন্তুষ্ট হচ্ছে। চেষ্টা করি কত সহজে আপনাদের সামনে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করা যায়। এবং এই প্রক্রিয়ায় যদি কেউ লাভবান হন, বা কিছু শিখতে যদি পারি সেই আমার পরম প্রাপ্তি। ব্যক্তিগত জীবনে শখের মিউজিশিয়ান। নেশার মধ্যে বই পড়া ও ঘুরে বেড়ানো।

Related Articles