শর্ট টার্ম মেমরি লস দূর করার ৫টি ঘরোয়া উপায়

শর্ট টার্ম মেমরি লস বা স্বল্পমেয়াদী স্মৃতির অর্থ হচ্ছে, আপনি কিছু সময় আগে যা শুনেছেন, দেখেছেন বা করেছেন তা প্রায়ই ভুলে যাচ্ছেন। এটি বয়স্ক হওয়ার একটি সাধারণ অংশ। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে তা মস্তিষ্কের আঘাত, ডিমেনশিয়া বা অন্যান্য মানসিক রোগের অবস্থাকেও নির্দেশ করতে পারে।

 

আপনাদের নিশ্চয় গজনী সিনেমার আমির খানের কথা মনে আছে। তিনি সন্ত্রাসীদের হাতে মাথায় চোট পেয়ে স্মৃতিভ্রমের শিকার হয়ে পড়েন। মূলত এতে তিনি অনেককিছুই মনে রাখতে পারেন না। আমাদের অনেকের মধ্যেই আমির খানের মতো সিরিয়াস না হলেও, অনেকটা স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাস দেখা দিতে পারে। আসুন আজকের আর্টিকেলে শর্ট টার্ম মেমরি লস কী, এর কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই। 

 

শর্ট টার্ম মেমরি লস বলতে কী বুঝায়?

সাধারণত স্মৃতি হারিয়ে যাওয়াকে ইংরেজীতে মেমরি লস বলে। আর সাইকোলজির ভাষায় স্বল্প সময়ের জন্য মানুষের ভুলে যাওয়ার প্রবণতাকে শর্ট টার্ম মেমোরি লস বলে। মূলত এই স্মৃতিভ্রম সমস্যা হলে অনেকেই সাময়িক সময়ের জন্য কোন তথ্য ভুলে যায় এবং অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারে না। অনেকসময়  টুকটাক ভুলে যাওয়ার প্রবণতা সবার মাঝেই থাকতে পারে, তবে কারো ক্ষেত্রে যদি এই পরিস্থিতি সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তাহলে তার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা জরুরী হয়ে দাঁড়ায়।

 

শর্ট টার্ম মেমরি লসের লক্ষণগুলি কি কি?

সাধারণত স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাসের কিছু লক্ষণ হল-

  • মানুষের নাম, পরিচয় ভুলে যাওয়া। 

  • কাউকে একই তথ্য বারবার জিজ্ঞাসা করা।

  • সাধারণত সে কি কাজ করছে, কিংবা কার সাথে আছে তা মনে করতে না পারা।

  • তখনকার সময় বা দিন  নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া। 

  • বিভিন্ন তথ্য মনে রাখতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া।

  • কোন দিকনির্দেশ বা পদক্ষেপ বুঝতে না পারা। 

  • সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বা ঘটনা ভুলে যাওয়া। 

  • কোথায় কোন জিনিস রেখেছে তা  ভুলে যাওয়া।

 

শর্ট টার্ম মেমরি লসের কারণ কী?

অনেকসময় বিভিন্ন কারণে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাস দেখা দিতে পারে, যেমন-

  • বার্ধক্য

  • ডিমেনশিয়া, যেমন আলঝেইমার রোগ

  • মস্তিষ্কের টিউমার

  • মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বা রক্তপাত

  • মাথার আঘাত, যেমন কনকাশন

  • মস্তিষ্কে বা তার চারপাশে সংক্রমণ

  • মানসিক রোগ যেমন- স্ট্রেস, উদ্বেগ বা বিষন্নতা

  • মস্তিষ্কের টিস্যু ক্ষতি করতে পারে এমন রোগ, যেমন পারকিনসন ডিজিজ বা হান্টিংটন ডিজিজ

  • ঘুমের অভাব

  • মৃগীরোগ

  • ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

  • অ্যালকোহল বা ড্রাগ সেবন করা 

  • ভিটামিন অথবা থাইরয়েডের অভাব

  • পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) 

  • ধূমপান করা 

  • অতিরিক্ত কাজ 

কিছু ক্ষেত্রে, ডাক্তাররা শর্ট টার্ম মেমরি লসের সঠিক কারণ জানতে পারেন না। এছাড়া স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাসের কিছু কারণ প্রগতিশীল, যা সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে পারে। এই কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ডিমেনশিয়া যা পারকিনসন্স ডিজিজ, হান্টিংটন ডিজিজ এবং আলঝেইমার রোগের সাথে সম্পর্কিত।

মানসিক রোগ থেকে দ্রুত মুক্তির ৯ টি উপায়!

 

কোন বয়সের মানুষের শর্ট টার্ম মেমরি লস দেখা দেয়?

সব বয়সের মানুষদেরই শর্ট টার্ম মেমরি লস দেখা দিতে পারে। এতে কোন নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই। অনেকসময় অনেক রোগের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে শর্ট টার্ম মেমরি লস দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চা থেকে বয়স্ক মানুষ, অনেকেরই স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাস সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে বার্ধক্যজনিত কারণে অনেকেরই শর্ট টার্ম মেমরি লস দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে বিচলিত না হয়ে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে, এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যেতে পারে।  

 

শিশুদের শর্ট টার্ম মেমরি লস কেন হয়? 

অনেকসময় শিশুদের মধ্যেও স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাসের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। বাচ্চাদের শর্ট টার্ম মেমরি লসের পেছনে বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান আছে। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগ যেমন- অটিজম, ডিসলেক্সিয়া, অনিয়মিত ঘুম, এডিএইচডি, মেডিকেশন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ইত্যাদির কারণে শিশুদের স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যা দেখা দেয়। আপনার সন্তানের মধ্যে এসব সমস্যা দেখা দিলে  চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী চলুন। 

অটিজম কেন হয়? অটিজম শিশুদের চিকিৎসা পদ্ধতি!

 

শর্ট টার্ম মেমরি লসের চিকিৎসা 

স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাসের চিকিৎসার জন্য আপনি একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন। মূলত ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খেলে এবং তার পরামর্শ নিয়ে চললে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এছাড়াও আপনি স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যা এড়াতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, তা হল- 

  • আপনি চিন্তামুক্ত থাকতে চেষ্টা করুন।

  • প্রতিদিন বেশি পরিমাণে পানি পান করুন।

  • রাতের বেলা কমপক্ষে ৭-৮ ঘন্টা ঘুমাতে চেষ্টা করুন।

  • যোগব্যায়াম এবং মেডিটেশন করুন।

  • অ্যালকোহল গ্রহণ করবেন না। 

  • আপনার মাথায় আঘাত করতে পারে, এমন কোন কাজকর্ম বা ক্রিয়াকলাপ থেকে দূরে থাকুন। 

  • মানসিকভাবে ভালো থাকতে চেষ্টা করুন। সেক্ষেত্রে নিজের পছন্দের কাজ যেমন- বই পড়া, গান শোনা কিংবা বাগান করতে পারেন।  

 

শর্ট টার্ম মেমরি লসের ঘরোয়া প্রতিকার

১. নিয়মিত ব্যায়াম করুন 

সাধারণত স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা সুস্থতার জন্য একটি অপরিহার্য অংশ। এতে শুধুমাত্র আপনার দেহ নয় বরং মনকেও ভালো রাখে। আপনি যদি নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম যেমন-হাঁটাহাঁটি, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা ইত্যাদি করেন, তবে মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাসের অংশগুলোতে রক্তপ্রবাহ বেড়ে কর্মক্ষমতাকে উন্নত করে। মূলত হিপোক্যাম্পাস মস্তিষ্কের একটি অংশ যা কিনা শেখা এবং স্মৃতিশক্তির জন্য খুবই দরকারি ভূমিকা পালন করে। আর তাইতো অ্যারোবিক ব্যায়াম আমাদের স্মৃতিশক্তি উন্নয়নের জন্যে একটি দুর্দান্ত উপায় হিসেবে বিবেচিত। 

২. পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে চেষ্টা করুন 

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের অভাব হলে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কেননা ঘুম স্মৃতির একত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মূলত এই প্রক্রিয়ায়  স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি শক্তিশালী হয় এবং তা দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত হয়। সেজন্য সঠিক পরিমাণে না ঘুমালে স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

পর্যাপ্ত ঘুম পেতে মেনে চলুন এই ৮টি উপায়

 

৩. দৈনিক মেডিটেশন করুন

আপনি দৈনিক মেডিটেশন করতে চেষ্টা করুন। কেননা মেডিটেশন শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কের জন্যও বেশ উপকারী। একটি গবেষণায় দেখা যায় যে- মেডিটেশন মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটার বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটার স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত। 

৪. সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন 

আপনি নিয়মিত সুষম এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে চেষ্টা করুন। কেননা মনে করা হয় যে, খাবার আপনার  মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার পাশাপাশি স্মৃতি এবং একাগ্রতাকে উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। সেক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন যে, কোন নির্দিষ্ট খাদ্য খেলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে তার বিজ্ঞানভিত্তিক তেমন প্রমাণ নেই। কিন্তু অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যুক্ত খাবার যেমন সবুজ শাকসবজি এবং রঙিন ফলমূল স্মৃতিশক্তিতে সহায়তা করে বলে ধারণা করা হয়। 

৫. ধূমপান এবং মদ্যপান করবেন না 

ধূমপান এবং মদ্যপান স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মূলত ঘুমের ঔষধ কিংবা নেশাজাত দ্রব্য স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।  তাই, স্মৃতিশক্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে যেকোন ধরণের মাদক এড়িয়ে চলা উচিত। 

মাদকাসক্তি যেভাবে মানসিক রোগে পরিণত হয়

 

শেষকথা

আপনার ভুলে যাওয়ার প্রবণতা যদি সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তবে ভয় না পেয়ে বরং একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। কেননা ডাক্তারের সুচিকিৎসা আর পরামর্শ অনুযায়ী চললে আপনি এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন।   

 

আরও পড়ুনঃ

 

Default user image

সাবরিনা দিলশাদ এলিন, লেখক, আস্থা লাইফ

আমি একজন কন্টেন্ট রাইটার! আমি বই পড়তে, গল্প করতে এবং ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করি। মূলত লেখালিখি আমার প্যাশন এবং তা এখন আমার পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে! আশা করি আস্থা লাইফের সাথে আমার এই লেখালিখির জার্নিটা অনেক দূর এগিয়ে যাবে!

Related Articles