মেজাজের অস্বাভাবিক পরিবর্তন হতে পারে বাইপোলার ডিজঅর্ডার! জেনে নিন উপসর্গ ও করণীয়।
বাইপোলার ডিজঅর্ডার একটি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ব্যাধি, যা মেজাজের গুরুতর পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। পরিবর্তন দুই রকম হতে পারে, অস্বাভাবিক উল্লাসিত পর্ব বা ম্যানিয়া (Mania) এবং চূড়ান্ত বিষণ্ণতা পর্ব বা ডিপ্রেশন। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন অতি আনন্দে হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাওয়া ও বিষনণ্ণতার ভারে ভেঙে পড়ার মাঝে ঘুরপাক খায়।
কেউ হয়ত প্রচন্ড রেগে যায়, ভাংচুর করে, কেউ খুব বেশি বানোয়াট কথা-বার্তা বলে, কেউ বা বিরক্তিকর হতাশার কথা বলতে চায়। কারো ভেতর এমন অস্বাভাবিক স্বভাব দেখলে আমরা সাধারণত এড়িয়ে চলি বা খারাপ প্রতিক্রিয়া করে ফেলি।
কিন্ত শরীরের রোগের মতই অনেক মানসিক রোগও যে মানুষের মাঝে বর্তমান সেদিকে আমাদের খেয়াল থাকে না। বাইপোলার ডিজঅর্ডারও এমন একটি রোগ। আপনিও খুব সম্ভবত আক্রান্ত দু-একজনকে চিনে থাকবেন কিন্তু রোগটি সম্পর্কে হয়ত জানেন না।
বাইপোলার ডিজঅর্ডার কেন হয়?
গবেষণায় জানা যায়, ব্রেইনের হিপোক্যামপাস (hippocampus) অংশের অস্বাভাবিকতা থেকে এই রোগটি হয়ে থাকে। যার ফলাফল, মেজাজের অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
রোগটি সাধারণত কৈশোর বয়সেই বাসা বাঁধে। তবে লক্ষণ গুলো পুরোপুরি প্রকাশ পেতে যৌবনের শুরু পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। চিকিৎসায় দেরি হবার কারণে রোগটি আরও জটিল হয়ে দাঁড়ায়। মূলত,
-
হরমোনের সমস্যা
-
জিনগত সমস্যা।
-
বড় মানসিক আঘাত ও
-
মাদকাসক্তিকেই
বাইপোলার ডিজঅর্ডারের কারণ বলে ধারণা করা হয়। যদিও সুস্পষ্ট কোন কারণ এখনো জানা যায়নি।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার এর প্রকারভেদ
বাইপোলার ডিসঅর্ডার প্রধানত তিন প্রকার,
১) বাইপোলার-১ঃ ২ সপ্তাহ বিষণ্ণতা পর্ব ও কমপক্ষে ৭ দিন থেকে ৩-৬ মাস পর্যন্ত অতি উল্লাস বা ম্যানিক পর্ব।
২) বাইপোলার-২ঃ ২ সপ্তাহ বিষণ্ণতার পর ৪ দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত ম্যানিক পর্ব।
৩) সাইক্লোথেমিয়াঃ অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর বিষণ্ণতা ও উল্লাস পর্ব কিন্তু একটানা ঘুরেফিরে ২ বছর চলতে পারে।
সাধারণ লক্ষণসমূহ
বাইপোলার ডিজঅর্ডারের লক্ষণগুলো এর প্রকারভেদ এর উপর নির্ভর করে। তবুও কিছু সাধারণ লক্ষণ সব বাইপোলারেই দেখা যায়।
-
দুশ্চিন্তা।
-
অমনোযোগ।
-
বিরক্তিবোধ।
-
বেপরোয়া আচরণ।
-
ভালো মন্দ কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না এমন বোধ।
-
বাস্তব বিচ্ছিন্নতা। কোন উদ্ভট কাল্পনিক বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন।
এছাড়াও বাইপোলারের দুটি পর্বে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে থাকে। আসুন জেনে নেই বিস্তারিত।
১) অতি উল্লসিত বা ম্যানিক পর্ব
অতি উল্লাসিত পর্বে রোগী প্রবল উত্তেজনা অনুভব করবে। হঠাৎ খুব হৈ-হুল্লোড় করতে পছন্দ করবে। সৃজনশীল কাজে আগ্রহ, আত্ববিশ্বাস এমনই আপাতদৃষ্টিতে কিছু ভালো লক্ষণ দেখা যাবে। কিন্তু পরিপূর্ণ ম্যানিক পর্বে প্রবেশ করলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
-
অতিরিক্ত আত্ববিশ্বাস।
-
প্রচন্ড বিরক্তিবোধ।
-
অযৌক্তিক ভাবে আশা করা।
-
বেশি কথা বলা।
-
ঘুমাতে না পারা।
-
অমনোযোগ।
-
তাড়াহুড়া করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া।
-
বেপরোয়া কাজ করা।
-
ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া।
হুট করে কোন উদ্ভট ব্যবসায় সব সঞ্চয় ব্যায় করে ফেলা, গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিক্রি করে ফেলা, দ্রুত গাড়ি চালানোর মত অসংখ্য বেপরোয়া আচরণ দেখা যায় এ পর্বে।
ম্যানিক পর্বে বিপদের লক্ষণ
কিছু বিপদের লক্ষণ জেনে রাখলে আপনার বন্ধু বা প্রিয়জনের সংকটকালীন অবস্থায় সহায্য করতে পারবেন,
-
হঠাৎ উত্তেজিত বা উল্লাসিত হওয়া।
-
অবাস্তব আশার কথা জানানো।
-
কোন কিছুতে সহজেই বিরক্ত হওয়া।
-
বেহিসাবি খরচ
-
উদ্ভট পরিকল্পনার মাঝে ঘোরাফেরা।
ম্যানিক পর্বে কাউকে যেভাবে সাহায্য করবেন
অবস্থা কতটুকু গুরুতর, তার উপর নির্ভর করে কিভাবে প্রতিক্রিয়া করবেন। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক কিছু ঔষধ ও ধ্যান করার পরামর্শ দেন। অবস্থা বেগতিক হলে হাসপাতালে নেবারও প্রয়োজন হতে পারে।
মনে রাখবেন আপনার প্রিয়জন খুব উল্লাসিত অবস্থায় আছে এবং খুব ভালো বোধ করছে। এমন অবস্থায় হাসপাতালে যেতে রাজি করানো কঠিন হতে পারে। সেক্ষেত্রে রেগুলার বডি চেকাপ বা এমন কিছু বলে চেষ্টা করুন। তার কাছের বন্ধু বা আত্মীয় কে জানান। শান্ত ভাবে কথা বলুন ও কোন রকম পরিহাস করা থেকে বিরত থাকুন।
২) বিষণ্ণতা পর্ব বা ডিপ্রেসিভ এপিসোড
বিষণ্ণতা পর্বে আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র মানসিক কষ্ট ভোগ করে। তবে রোগী বুঝতে পারে কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে, কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মানসিক শক্তি বা ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে। বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন পর্বের লক্ষণ গুলো হল-
-
দুঃখবোধ, আশাহীনতা, শুন্যতাবোধ।
-
বিরক্তি
-
নির্লিপ্ততা
-
কোন কাজে শক্তি না পাওয়া।
-
শারীরিক ও মানুসিক শক্তিহীনতা।
-
ওজনে পরিবর্তন, খুব বেশি অথবা খুব কম খাওয়া।
-
মনোযোগহীনতা
-
অপরাধবোধ
-
মৃত্যুচিন্তা ও আত্মহত্যা প্রবণতা।
যেভাবে সাহায্য করবেন
উল্লাসিত পর্বের মতো বিষণ্ণতা পর্বেও ডাক্তার কিছু ঔষধ দেবেন ও মেডিটেশন করতে পরামর্শ দেবেন। আত্মহত্যা প্রবণ ব্যক্তিকে হাসপাতালে রাখবেন।
আপনি চেষ্টা করবেন মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনতে। কোনরকম বিচার বা মন্তব্য করতে যাবেন না। চেষ্টা করবেন তাকে ইতিবাচক কথা বলে উদ্দীপিত করতে।
বিপদ সংকেত গুলো জানুন
-
উদ্ধত আচরণ ও কথাবার্তা
-
বিপজ্জনক আচরণ
-
হুমকি দেওয়া
-
আত্মহত্যা বা মৃত্যু নিয়ে কথা বলা।
বিপদ বুঝতে পারলে আপনার প্রিয়জনের সাথে সাথে থাকুন, ধৈর্য ধরে তার কথা শুনুন। রোগীর ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং বন্ধু অথবা আত্মীয়দের জানান।
আত্মহত্যা রোধ
যদি মনে করেন রোগী আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারে,
-
রোগীর সাথে সাথে থাকুন।
-
আত্মহত্যা প্রতিরোধ হটলাইনে কল করুন।
-
অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে বিস্তারিত বলুন।
-
পিস্তল, ছুরি, ব্লেড, বিষ জাতীয় সবকিছু সরিয়ে ফেলুন।
আপনার নিজের মনেরও যত্ন নিন
বাইপোলার ডিজঅর্ডার আক্রান্ত ব্যাক্তির উদ্ভট আচরণ ও ব্যবহারের প্রায় পুরোটাই তার কাছের মানুষকে সহ্য করতে হয়। তাই আপনি যদি এমন রোগীর খেয়াল রাখেন, আপনার নিজর মনেরও যত্ন নেওয়া জরুরী।
-
নিজের ব্যক্তিগত জীবন, স্বাদ-আহ্লাদ বিসর্জন দেবেন না।
-
সারা জীবন মানুষের সেবাই করে আসলাম এমন ভেবে কষ্ট পাবেন না।
-
রোগীর কাছের লোক-বন্ধুদের নিয়ে একটা সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করুন। সবাই মিলে সাহায্য করতে খারাপ লাগবে না।
-
রোগীর ডাক্তারের সাথে আপনিও কথা বলুন।
বাইপোলার আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য পরামর্শ
বাইপোলার আক্রান্ত ব্যাক্তি সবসময় যে আনন্দ ও বিষাদে ডুবে থাকে তা কিন্তু নয়। স্বভাবিক অবস্থাতে তারা সাধারণ মানুষের মতই। স্বাভাবিক সময়ে রোগীর সাথে সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করুন। আপনার প্রিয়জনকে পরামর্শ গুলো দিন বা নিজে আক্রান্ত হলে মেনে চলুন,
-
স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয় এমন কারো সাথে কথা বলুন।
-
৮ ঘন্টা ঘুমান।
-
আক্রান্ত অবস্থায় দৈনন্দিন কাজ কমিয়ে ফেলুন।
-
সৃজনশীল কিছু করুন। যেমন ডায়েরী লেখা, ছবি আঁকা অথবা ছোট একটা কবিতা।
-
আলোতে থাকুন।
-
ব্যায়াম করুন।
-
চিনি, মদ ও চা-কফি থেকে বিরত থাকুন।
-
একা থাকা পরিহার করুন।
-
বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করুন।
-
নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হবে এমন কিছু করুন। কোন ক্লাবে জয়েন করুন, কোথাও কোর্স করুন।
-
বাইপোলার ডিজঅর্ডার নিয়ে পড়ুন।
-
ডাক্তারের নাম্বার, কাছের লোকের নাম্বার ও শুরুর লক্ষনগুলো ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করুন ও সাথে রাখুন।
-
চাপ পরিহার করুন।
-
লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।
বাইপোলার ডিজঅর্ডার একটি জীবনব্যাপী চলা রোগ। যা কিনা রোগীর সাথে তার আশেপাশের মানুষের জীবনকেও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই রোগীর সাথে সাথে তার আশেপাশের মানুষেরও মানসিক খেয়াল রাখা জরুরী।
মনে রাখবেন, সুষ্ঠু চিকিৎসা, মানিয়ে চলা ও একটু সাপোর্টের মাধ্যমে বেশিরভাগ মানুষই সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে সুখী জীবন-যাপন করতে পারেন।
