অটিজম কেন হয়? অটিজম শিশুদের চিকিৎসা পদ্ধতি!
আমাদের সমাজে অটিজম নিয়ে অনেক ভুল ধারনা রয়েছে। কিছু অজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাবে শিশুকে আজীবন কষ্ট বয়ে বেড়াতে হয়। কিভাবে অটিজম নির্ণয় করব এবং কিভাবে অটিজম প্রতিরোধ সম্ভব জেনে নিই। তাই আসুন অটিজম সম্পর্কে জানি ও সচেতন হই।
অটিজম একটি নিউরোডেভেলপমেণ্টাল ডিজঅর্ডার অর্থাৎ মানসিক বিকাশঘটিত সমস্যা। এটার অপর নাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার ( A.S.D.)। এক্ষেত্রে নার্ভ বা নার্ভাস সিস্টেম অর্থাৎ স্নায়ু বা স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও পরিবর্ধন জনিত অস্বাভাবিকতা থাকে। সাধারণত দেড় বছর থেকে ৩ বছর সময়ের মধ্যেই এই রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে অসুবিধা হয়, সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। অটিজমের কারণে কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে আবার অনেক ক্ষেত্রে শিশুর মানসিক ও ভাষার উপর দক্ষতাও কম থাকে।
অটিজম সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
-
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি ১৬০ জন শিশুর মধ্যে ১ জনের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) রয়েছে
-
মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা চার গুণ বেশি
-
অটিজম আক্রান্ত প্রায় ৪০% শিশু কথা বলে না। অটিজমে আক্রান্ত প্রায় ২৫% –৩০% বাচ্চাদের ১২ থেকে ১৮ মাস বয়সে কিছু শব্দ থাকে এবং পরে সেগুলি হারাতে থাকে। অন্যরা হয়তো কথা বলতে পারেন, তবে শৈশব শেষে তা আর পারে না।
-
অটিজম আক্রান্ত দুটি মানুষ কখনো এক রকম হয় না
-
অটিজমের হার গত বিশ বছরে অবিচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে
-
অটিজম দ্রুত বর্ধমান একটি মানসিক ব্যাধি
-
২০০৮ সালের একটি ডেনিশ স্টাডিতে দেখা গেছে যে অটিজম রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ জনগণের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ
-
অটিজমের চিকিৎসা সম্পর্কিত কোনও সনাক্তকরণ নেই
-
অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা অগ্রগতি করে, তবে প্রথম দিকের চিকিৎসাই মুখ্য
বাংলাদেশে অটিজম
গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত বিশ্বের মত বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের সচ্ছল পরিবারগুলোতে অটিজমের প্রাদুর্ভাব বেশি। গ্রামাঞ্চলে ও অসচ্ছল পরিবারে অটিজমের প্রকোপ তুলনামূলক কম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর নিউরোডেভেলপমেন্ট এন্ড অটিজম ইন চিলড্রেন এর মতে গেছে যে, শহরের শিশুদের মাঝে অটিজমের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ২০১৩ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ৭২০০ জনসংখার মাঝে প্রতি ১০০০ শিশুর মাঝে ১.৫ জনের অটিজমের লক্ষণ রয়েছে। ঢাকা শহরে প্রতি ১০০০০ জনে ৩০০ জন এবং গ্রামাঞ্চলে প্রতি ১০০০০ জনে ৭ জন শিশু অটিজমে ভুগছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনসংখ্যার মাঝে ১৮ থেকে ৩০ মাসের শিশুদের অটিজমের বিস্তারের লক্ষ করা যায়। এই সমীক্ষায় আরও দেখা যায় যে, প্রতি ৪ জন শিশুর মাঝে ৩ জন ছেলে এবং ১ জন মেয়ে শিশু যাদের বয়স ২০-৩০ মাসের মধ্যে।
অটিজমের বৈশিষ্ট্য এবং উপসর্গ
শিশু বা কিশোরের উপর নির্ভর করে অটিজমের লক্ষণগুলির একটি খুব আলাদা ধরণ রয়েছে। এই লক্ষণগুলির মধ্যে অনেকগুলি বিসদৃশ হলেও কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ রয়েছে।
-
অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তি। যেমন, মুখের ভাবগুলি যা সে বলছে তার সাথে মেলে না।
-
অন্যান্যদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
-
একা থাকতে পছন্দ করে
-
আরেকজনের অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া বুঝতে অসুবিধা
-
কোন কিছুর স্পর্শ করা থেকে দূরে থাকা
-
একই বয়সী বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে অসুবিধা বা ব্যর্থতা
-
অটিজম ব্যক্তির ভারসাম্য রাখতে সমস্যা হতে পারে
অটিস্টিক ব্যক্তির সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি প্রভাব থাকতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে,
-
অস্বাভাবিক গলার স্বর করে কথা বলা
-
অন্যের সাথে চোখের যোগাযোগ এড়ানো
-
নিজেদের নামে সাড়া না দেওয়া
-
কথা দেরীতে বিকাশ লাভ করে
-
কথোপকথন বজায় রাখতে সমস্যা
-
ঘন ঘন বাক্যাংশ পুনরাবৃত্তি
-
অনুভূতি বুঝতে এবং তাদের নিজস্ব মত প্রকাশে অসুবিধা
যোগাযোগের অক্ষমতার পাশাপাশি একটি অটিস্টিক ব্যক্তি পুনরাবৃত্ত বা অস্বাভাবিক আচরণও প্রদর্শন করতে পারে। এর উদাহরণগুলির মধ্যে রয়েছে,
-
কোনও বিষয়ে এত বেশি ধ্যানমগ্ন হয়ে উঠে যে মনে হয় এটি তাদের গ্রাস করে ফেলেছে
-
খেলনা বা বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে
-
বারবার একই গতিতে চলমান থাকে। যেমন পাশাপাশি দোল খাওয়া।
-
খুব সুশৃঙ্খল উপায়ে খেলনা বা জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখে
অটিজমের প্রকারভেদ
সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত, বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরণের অটিজম সম্পর্কে কথা বলেছিলেন, যেমন অটিস্টিক ডিসঅর্ডার, এস্পারগার্স সিন্ড্রোম, ব্যাপ্তিশিীল বিকাশজনিত ব্যাধি অন্যথায় নির্দিষ্ট করা হয়নি (পিডিডি-এনওএস)। তবে এখন তাদের সবাইকে বলা হয় “অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার।” আসুন জেনে নেই তাদের সম্পর্কে-
অটিস্টিক ডিসঅর্ডার
কখনও কখনও এটি "ক্লাসিক অটিজম" নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে অটিজমের লক্ষণগুলি তীব্র ভাবে প্রকাশ পায়। এতে ভাষার বিলম্ব, সামাজিক ও যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতা এবং অস্বাভাবিক আচরণ প্রকাশ পায়। এছাড়াও শেখার অনাগ্রহ এবং কম বুদ্ধির হতে পারে।
এস্পারগার্স সিন্ড্রোম
লক্ষণ গুলি ক্লাসিক অটিজমের চেয়ে হালকা। এতে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এদের কোনও ভাষা সমস্যা বা বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা নাও থাকতে পারে। তবে ভাষা বিকাশের কিছু ক্ষেত্র প্রভাবিত হতে পারে। মানুষের মানসিক অবস্থা বা মেজাজ বুঝতে সমস্যা হতে পারে। তবে কিছু শিশুদের ক্ষেত্রে এমন দক্ষতা রয়েছে যেখানে যুক্তি, স্মৃতি এবং সৃজনশীলতার প্রয়োজন যেমন গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং সংগীত।
ব্যাপ্তিশিীল বিকাশজনিত ব্যাধি (পিডিডি-এনওএস)
এটি "এটিপিকাল অটিজম" নামেও পরিচিত। এই ক্ষেত্রে লক্ষণ বা উপসর্গগুলি এস্পারগার্স সিন্ড্রোম এর চেয়ে মারাত্মক, তবে অটিস্টিক ডিসঅর্ডার এর তুলনায় তীব্র নয়। অর্থাৎ এই শ্রেণীর ব্যক্তিরা অটিস্টিক ডিসঅর্ডার বা এস্পারগার্স সিন্ড্রোমের কিছু মানদণ্ড পূরণ করে, কিন্তু সবগুলিই নয়। তবে সামাজিক এবং যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে।
অটিজমের কারণ
গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে অটিজমের কোনও একক মূল কারণ নেই। যেহেতু এটি একটি বিশেষ জটিল ব্যাধি এবং উপসর্গে গুলো ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিভেদে পৃথক হয়, সম্ভবত অটিজম বিভিন্ন কারণ দ্বারা সৃষ্ট। এটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ যে অটিজম এবং ভ্যাকসিন এর মধ্যে কোনও প্রমাণিত যোগসূত্র নেই। তবে জেনেটিক্স এবং পরিবেশগত উভয় কারণ এই ব্যাধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অটিজমের সাধারণ কারণগুলির মধ্যে রয়েছে,
জিনতত্ত্ব
গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে কয়েকটি জিন অটিজমের সাথে জড়িত। এর মধ্যে কিছু জিন শিশুকে এই ব্যাধির জন্য আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। অন্যরা মস্তিষ্কের বিকাশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং মস্তিষ্কের কোষ যোগাযোগ করে। এছাড়া অন্যান্য জিনগুলি লক্ষণগুলির তীব্রতা নির্ধারণ করতে পারে। জিনগুলির প্রতিটি সমস্যা স্বল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে দায়ী, তবে একসাথে জিনের প্রভাব স্পষ্টভাবে যথেষ্ট। কিছু জিন উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হতে পারে, অন্যগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটতে পারে।
পরিবেশগত
গবেষকরা বর্তমানে পরিবেশগত কারণগুলি নিয়ে গবেষণা করছেন যা অটিজমের দিকে পরিচালিত করতে পারে। ভাইরাল সংক্রমণ যে অটিজমে ভূমিকা নিতে পারে তারও সন্ধান করা হচ্ছে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় জটিলতাগুলি বাচ্চাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কিনা বা বাতাসে দূষণ কিছু শিশু বা কিশোরকে অটিজমে প্রভাবিত করছে কিনা তারও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এছাড়া মস্তিষ্কের বিভিন্ন সমস্যার কারণে অটিজম হতে পারে, যেমন মস্তিষ্কের নিউরো-কেমিক্যালের অসামঞ্জস্যতা বা মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়া। অন্তক্ষরা গ্রন্থির হরমোন নিঃসরণে অসামঞ্জস্যতাও অটিজমের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
অটিজম নির্ণয় পদ্ধতি
অন্যান্য রোগের মত অটিজম নির্ণয় করা সহজ নয় কারণ এর কোন স্বাভাবিক পরীক্ষা পদ্ধতি নেই। চিকিৎসকরা এই শিশুদের আচরণগত দিক এবং বিকাশ দেখে নির্ণয় করে থাকেন। এই নির্ণয় সাধারণত ২ টি পদ্ধতিতে করা হয়,
শিশুর বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট স্ক্রিনিং
এ পদ্ধতি হল শিশুরা তাদের বয়সের সাথে স্বাভাবিক চালচলন বা দক্ষতা অর্জন করছে কিনা বা তাদের বিলম্ব হচ্ছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা। এই সময় চিকিৎসক পিতামাতাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারে বা পরীক্ষার সময় তাদের সন্তানের সাথে কথা বলতে এবং খেলতে পারে। সন্তানটি কীভাবে শেখে, কথা বলে, আচরণ করে এবং চলাফেরা করে ইত্যাদি দেখার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। এগুলির যে কোনও একটি ক্ষেত্রে দেরি হওয়া অটিজম সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
বিশেষ অথবা কম্প্রিহেনসিভ ডায়াগনস্টিক ইভালুয়্যাশন
রোগ নির্ণয়ের এই পদ্ধতিতে শিশুর আচরণ এবং বিকাশ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করা হয় এবং সেই সাথে পিতা-মাতার মতামতও নেয়া হয়। এখানে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকে যার মধ্যে রয়েছে শিশুর শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি নির্ণয়, জেনেটিক টেস্টিং, স্নায়ুসংক্রান্ত পরীক্ষা ইত্যাদি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর আরও বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য শিশু এবং পিতা-মাতাকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে,
-
শিশু বিকাশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ
-
শিশু নিউরোলজিস্ট
-
শিশু মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
অটিজমের ঝুঁকি সমূহ
-
ছেলে শিশুদের অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি
-
কিছু কিছু রোগের জন্য অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের লক্ষণ স্বাভাবিক ঝুঁকির চেয়ে বেশি থাকে। এইসব রোগের মধ্যে রয়েছে ফ্রাজাইল এক্স সিনড্রোম, টিউবারাস স্ক্লেরোসিস, টুরেট সিনড্রোম, রিট সিনড্রোম, সেরিব্রাল ডাইজেজনেসিস এবং মৃগী।
-
বেশি বয়সে গর্ভধারণ
-
গর্ভকালীন বা প্রসবকালীন ওষুধ ব্যবহারে অসতর্ক থাকলে
-
গর্ভাবস্থায় রক্তপাত
-
মাতৃগর্ভকালীন ডায়াবেটিস
-
গর্ভধারণের ২৬ সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে
-
বেশী বয়ষ্ক বাবা-মা এবং অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে একটি সংযোগ থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন তবে গবেষকরা এটা নিয়ে এখন গবেষণা করছেন।
অটিজম নিয়ে ভুল ধারণা
-
আমাদের সমাজের অনেকেই মনে করেন, অটিজম শুধুই বংশগত রোগ। কিন্তু সত্য হল যে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক বাবা-মায়েরও অটিজমে আক্রান্ত শিশু জন্মগ্রহণ করে থাকে। যদি পরিবারের বা বংশের কেউ এই সমস্যায় আক্রান্ত নাও হয় তাও একটি শিশু অটিস্টিক হতে পারে।
-
বাবা-মায়ের সঠিক পরিচর্যার অভাবে শিশু অটিস্টিক হয় এমন একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনেকের মাঝেই রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, একান্নবর্তী পরিবার অথবা একমাত্র সন্তান হওয়ার পরও অটিস্টিক শিশু হয়ে থাকে।
-
অটিস্টিক শিশুকে অনেকে কুসংস্কারে সংজ্ঞায়িত করে থাকেন, যা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। এরূপ বিশ্বাসের ফলে অনেক সময় শিশুর ভুল চিকিৎসা হয়ে থাকে, যা শিশুর জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
-
কিছু কিছু শিশু জন্ম ও স্বভাবগতভাবেই একটু বেশি অস্থির, চঞ্চল, রাগী ও জেদি প্রকৃতির হয়ে থাকে। এতে করে শিশুটি অটিস্টিক শিশু হতে পারে এমনটা ভেবে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই।
অটিজমের চিকিৎসা
অটিজম চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত কোনও নিরাময়ের অস্তিত্ব নেই। তবে অটিজমের উপসর্গ গুলি কমিয়ে এবং মানসিক বিকাশকে কিছুটা উন্নতি করে এর চিকিৎসা দেওয়া হয়। অটিজমের একদম প্রথমদিকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে অটিস্টিক শিশুকে সামাজিক, যোগাযোগ, কার্যকরী এবং আচরণগত দক্ষতা শিখতে সহায়তা করা যেতে পারে।
যদি আপনার শিশুর অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হয় তবে চিকিৎসার কৌশল তৈরির বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলুন এবং আপনার সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে পেশাদারদের একটি দল তৈরি করুন।
আচরণ এবং যোগাযোগ থেরাপি
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের সাথে সম্পর্কিত কিছু থেরাপি রয়েছে যেগুলো সামাজিক, ভাষা এবং আচরণগত অসুবিধাগুলির উপর গুরুত্বারোপ করে। আবার কিছু আছে যেগুলো আচরণগত অসুবিধাগুলি হ্রাস করে এবং নতুন দক্ষতা শেখানোর উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। অন্যান্য থেরাপিগুলি শিশুদের সামাজিক পরিস্থিতিতে কীভাবে আচরণ করতে হয় বা অন্যের সাথে আরও ভাল যোগাযোগ করতে হয় সে বিষয়ে শেখানোর উপর মনোনিবেশ করে।
শিক্ষাগত থেরাপি
অটিস্টিক শিশুরা প্রায়শই উচ্চ কাঠামোগত শিক্ষামূলক প্রোগ্রামগুলিতে ভাল সাড়া দেয়। সফল প্রোগ্রামগুলিতে সাধারণত বিশেষজ্ঞদের একটি দল এবং বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ অন্তর্ভুক্ত থাকে যা সামাজিক দক্ষতা, যোগাযোগ এবং আচরণ উন্নত করে। প্রাক বিদ্যালয়ের শিশুরা যারা নিবিড় এবং ব্যক্তিগত আচরণ শিক্ষা গ্রহণ করে তারা প্রায়শই ভাল অগ্রগতি দেখায়।
পারিবারিক থেরাপি
পিতামাতারা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাদের বাচ্চাদের সাথে কীভাবে খেলতে এবং ব্যবহার করতে হয় তা শিখতে পারে। এইসব কার্যকলাপ সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা প্রচার করে, আচরণগত সমস্যা পরিচালনা করতে পারে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার দক্ষতা এবং যোগাযোগের শিক্ষা দেয়।
অন্যান্য চিকিৎসা
আপনার সন্তানের প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে, যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করতে ভাষা থেরাপি, দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্রিয়াকলাপ শেখানোর জন্য শরীরবৃত্তীয় থেরাপি এবং চলাচল ও ভারসাম্য উন্নত করতে শারীরিক থেরাপি উপকারী হতে পারে। একজন মনোবিজ্ঞানী সআচরণগত সমস্যা সমাধানের উপায়গুলির পরামর্শ দিতে পারেন।
মেডিকেশন
কোনও ঔষধ অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের মূল লক্ষণগুলিকে উন্নত করতে পারে না, তবে নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আপনার বাচ্চা অস্বাভাবিক হলে ডাক্তারের পরামর্শে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দেওয়া যেতে পারে অ্যান্টিসাইকোটিক ঔষধগুলি কখনও কখনও গুরুতর আচরণগত সমস্যার চিকিত্সার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টস ঔষধ উদ্বেগের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে ঔষধ ব্যাবহারে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে।
অটিজম প্রতিরোধ
গর্ভবতী মহিলাদের বাচ্চাদের মধ্যে অটিজম প্রতিরোধের জন্য অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া উচিত। এই সতর্কতাগুলির মধ্যে রয়েছে,
নিয়মিত ডাক্তারের সাথে দেখা এবং আপনার ওষুধ পরীক্ষা করা
অটিজম প্রতিরোধের জন্য, গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিক্ষা এবং ঔষধ গুরুত্ব সহকারে খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি আপনাকে আপনার শরীর এবং শিশুর দেহের সমস্ত পরিবর্তনগুলি নির্ণয় রাখতে সহায়তা করবে। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ আপনার গর্ভাবস্থায় আপনি যে অভ্যাসগুলি গঠন করবেন, অবশেষে এটি আপনার সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য দায়ী হবে।
বায়ু-দূষণ হতে দূরে থাকা
হাভার্ড স্কুল অফ পাবলিক হেলথের এক সমীক্ষায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে মায়ের তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময় শিশুর মধ্যে অটিজম হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যায়, যদি মা খুব বেশি দূষণের মুখোমুখি হন। এর জন্য দায়ী বিশেষ উপাদানগুলোকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি। তবে দূষণের মাত্রা বেশি হলে বাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থান করা বা অভ্যন্তরীণ অনুশীলন এবং ক্রিয়াকলাপ করলে অবশ্যই মাকে ভালো থাকতে সহায়তা করবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানব পরিষেবা বিভাগ গর্ভবতী মহিলাকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৮০০ মাইক্রগ্রাম ফলিক এসিড গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে মহিলারা গর্ভাবস্থায় কম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করেন তাদের শিশু অটিজম বিকাশ ঘটাতে পারে।
পরিকল্পিত গর্ভধারণ
গবেষণায় দেখা গেছে যে গর্ভধারণে ব্যবধান দুই থেকে পাঁচ বছরের সময়কালের মধ্যে হলে অটিজম বিকাশের সবচেয়ে কম সম্ভাবনা থাকে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে প্রথম গর্ভাবস্থার ১২ মাসের মধ্যে পরবর্তী গর্ভধারণ করা শিশুদের মধ্যে অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। এছাড়া অটিজমের ঝুঁকি বাড়ে যদি বাবা-মা বেশি বয়সের হয়, তাই পরিবার শুরু করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন।
অ্যালকোহল পান করা এবং মাদক সেবন করা থেকে বিরত থাকুন
গর্ভাবস্থায় মাদক এবং অ্যালকোহল গ্রহণ আপনার সন্তানের অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। কারণ এই দুটিতে থাকা রাসায়নিক উপাদান একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোনও অবস্থাতেই এইগুলো সেবন করা উচিত নয়।
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার যুক্ত শিশুরা সাধারণত সারা জীবন তাদের সমস্যাগুলির জন্য ভোগতে থাকে। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং মানুষের সমর্থন পেলে তারাও সামনে অগ্রসর হতে পারে। তাই অটিজমের বেশ কয়েকটি লক্ষণ শিশুর মধ্যে প্রকাশ পেলেই দেরি না করে প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের সুযোগগুলির জন্য বিভিন্ন রকম পরিকল্পনা যেমন কর্মসংস্থান, কলেজ, জীবনযাত্রার পরিস্থিতি, স্বাধীনতা এবং সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলি এই প্রক্রিয়াটিকে মসৃণ করে তুলতে পারে।
