পৃথিবী বদলে দেয়া কিছু সংক্রামক রোগ! [পর্ব ১]

ভাইরাস নামের এমন অদেখা জীবের সুত্রপাত কিন্তু আমাদের জন্য নতুন নয়, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে ৩০০০ বছর আগেও ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ ছিল, সেসব রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারাও যেত। আমাদের দেশে আগে কলেরার মহামারীতে অনেক মানুষ মারা গিয়েছে। এছাড়াও আমাদের ইতিহাসে বলা আছে যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া সহ আরও কত মাহামারীর নাম যারা এইসব অণুজীবের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই ধারাবাহিকভাবে সেইসব কিছু মহামারী বলব। সংক্রামক রোগ নিয়ে আজকে আমাদের প্রথম পর্বে থাছে গুটিবসন্ত, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, জিকা ভাইরাস এবং হাম।

এ যেনো এক মৃত্যুকূপ, চোখে দেখা যায় না এমন এক জীবের জন্য বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে লাশের মিছিল এবং এর শেষ কোথায় একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তাই বলতে পারেন। ডিসেম্বর, ২০১৯ এর দিকে চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া এই নতুন এই করোনা প্রজাতির ভাইরাসটি দ্বারা সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগের আবিষ্কার হয়নি কোনো প্রতিষেধক, অপরদিকে লাশের সংখ্যা প্রতিদিনই নতুন নতুন রেকর্ড করছে। এখনো চলছে এর ধ্বংসযজ্ঞ, আমাদের দেশেও বাদ যায়নি এই মরণ ঘাতক থেকে। ইতিমধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে বিশ্ব মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 

কোভিড-১৯ এবং করোনা ভাইরাস নিয়ে তো কম বেশি আমরা জানি। তাই আমরা আজকে জানবো আরো কিছু সংক্রামক রোগের ইতিহাস নিয়ে, যারা একসময় মহা তান্ডব চালিয়েছে এই বিশ্বে এবং কিছুকিছু এখনও ফিরে আসে প্রতিবছর তার মৃত্যু ক্ষুধা নিয়ে। 

 

গুটিবসন্ত  বা স্মল পক্স

জলবসন্ত বা চিকেন পক্স রোগের সাথে আমরা সবাই পরিচিত, এমনকি আমাদের সমাজে একটা কুসংস্কারও আছে যে জীবনে একবারের জন্য হলেও জলবসন্ততে আক্রান্ত হয় মানুষ এবং একবার হয়ে গেলে আর হওয়ার সম্ভবনা থাকে না। কিন্তু গুটিবসন্ত নামেও যে একপ্রকার বসন্ত আছে সেটা আমরা কয়জন জানি? একসময় যে রোগ পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেই রোগটি আজ আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তাই আমাদের অনেকের কাছে এই রোগটি রয়েছে অজানা। গুটিবসন্ত বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত হয়েছে ঠিক কিন্তু ইতিহাস তাকে রেখে দিয়েছে, ধরে রেখেছে এর ভয়াবহতা। 

প্রায় ৩০০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশ এবং প্রাচীন মিশরে এই রোগের উৎপত্তি হয়েছিল এবং সে সময় এই রোগকে সাধারণত চামড়ায় ক্ষত সৃষ্টিকারী রোগ হিসেবেই জানত। সেসময় গুটিবসন্ত ছিল একটি ত্রাসের নাম কারণ এটি ছিল ভয়ানক ছোঁয়াচে একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সম্পূর্ণ শরীর দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ যুক্ত ছোট ছোট ফুঁসকুড়িতে ভরে যেত, যা পরবর্তীতে ফেটে গিয়ে যদি খুব সামান্য পরিমাণেও এই পুঁজ অন্য কারো শরীরে লাগতো তাহলে সেই সুস্থ ব্যক্তিও তখন আক্রান্ত হত এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভেরিওয়ালা ভাইরাস এই গুটিবসন্তের জন্য দায়ী এবং এই রোগে আক্রান্তদের প্রায় এক তৃতীয়াংশই মৃত্যুবরণ করেছিল। এই রোগ তার মৃত্যুযজ্ঞ শুরু করেছিল বাংলাদেশেও। ১৯৭৫ সালের দিকে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল তাদের ৪৬ শতাংশই মৃত্যুবরণ করেছিল। 

প্রায় একই রকম দেখতে কিন্তু গুঁটি বসন্ত থেকে কম শক্তিসম্পন্ন গোবসন্তের জীবাণু একজন সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করার মাধ্যমে গুঁটিবসন্তের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার ইতিহাসে জায়গা করে নেন এবং বিশ্বের কাছে দিয়ে যান গুটিবসন্তের মতো অভিশাপকে নির্মূল করার মন্ত্র। 

১৯৮০ সালে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিক ভাবে এই রোগের বিলুপ্তি হওয়ার ঘোষণা দেয় কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ভাইরোলজি সেন্টারে গুটিবসন্তের জীবাণু রেখে দেয়া হয়েছে এবং এখনো তাদের কাছে আছে এই জীবাণু।

 

ম্যালেরিয়া

অনেক অনেক বছর আগের কথা, প্রাচীন গ্রীক সম্রাজ্যের চাঞ্চল্যপূর্ণ এথেন্স শহরে হঠাৎ এক অভিশাপ নেমে এসেছিল।  বছরজুড়ে উৎসবমুখর থাকা এথেন্স শহরের প্রাঙ্গন বেশ কিছুদিন ধরে তার চাঞ্চল্য হারিয়েছে, নেই কোনো মানুষের আনাগোনা কারণ পুরো শহর তখন থরথর করে কাপছে অজানা এক জ্বরে। এথেন্সের এমন কোনো ঘর বাকি ছিল না যারা এই জ্বরে আক্রান্ত হয়নি কিন্তু হঠাৎ করে এই জ্বর কোথা থেকে এলো আর কিভাবেই বা এলো এই শহরে? এই প্রশ্নের উত্তরে গ্রীক রাজ গেলেন এক ডোবার দিকে আর কাপড় দিয়ে নাক চেপে ইশারা করলেন এই ডোবার পানি থেকে আসা বিষাক্ত বাতাসই হলো এই জ্বরের অন্যতম কারণ।

আর তাই এই রোগের নামও রাখা হয়েছে ম্যালেরিয়া, যার অর্থ ছিল বিষাক্ত বাতাস। শুধু গ্রীক সম্রাজ্যই নয় সেসময়  পুরো পৃথিবীর মানুষ জানত বদ্ধ জলাশয়ে বিষাক্ত পানির বাষ্প থেকেই ম্যালেরিয়া জ্বরের উৎপত্তি কিন্তু পরবর্তী কালে বিজ্ঞানী চার্লস ল্যাভেরন এবং রোনাল্ড রস ম্যালেরিয়াকে পরজীবী বাহিত রোগ বলে চিহ্নিত করেন এবং দায়ী করেন এই বদ্ধ জলাশয়ে জন্ম নেওয়া মশাকে যার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে থাকে।  শুনতে অবাক লাগলেও একটি মশাও আজ আপনার জন্য মৃত্যুর কারণ হতে পারে যদি সেটি ম্যালেরিয়ার মতো কোনো ভয়ংকর জীবাণু বহন করে থাকে। 

সায়েন্টিফিক আমেরিকার তথ্যনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১২৫ ধরণের ম্যালেরিয়া জ্বরের আস্তিত্ব পাওয়া গেছে যারা মূলত স্তন্যপায়ী বিভিন্ন প্রাণী, পাখি এবং সরীসৃপদের আক্রান্ত করে। কিন্তু মানুষের শরীরে মাত্র চার ধরণের পরজীবীর মাধ্যমে এই রোগ সংক্রমিত হয়ে থাকে, সেগুলো হচ্ছে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপ্যারাম, প্লাজমোডিয়াম ম্যালেরিয়া, প্লাজমোডিয়াম ভিভ্যাক্স এবং প্লাজমোডিয়াম ওভালি। 

ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে আফ্রিকায় শৈশব কালের প্রায় ২০ শতাংশ মৃত্যু হয়ে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে। যদিও ম্যালেরিয়া এখন প্রতিরোধ এবং নিরাময় যোগ্য, তবুও এর জীবাণু এখনো রয়েছে আফ্রিকার পাশাপাশি অন্যান্য মহাদেশ গুলোতেও। 

১৯৫১ সালের মধ্যে কীটনাশক ডিডিটি (ডাই ক্লোরো ডাই ফিনাইল ট্রাই ক্লোরোইথেন) এর ব্যাবহারের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্মূল করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রচার, জনসচেতনামুলক কাজ এবং কীটনাশকের ব্যাবহারের মাধ্যমে কম্বোডিয়া সহ কয়েকটি দেশে এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিল।  কিন্তু এই রোগের জীবাণু এখনো আমাদের চারপাশে বিচরণ করছে। আমাদের দেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে এখনো অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকে এবং অনেকে মারাও যায়। তাই আমাদের হতে হবে সতর্ক, মশা যাতে না জন্মায় সেই জন্য ডোবা নালাতে কীটনাশক দিতে হবে, জমানো পানি পরিষ্কার করতে হতে, সহজ ভাষায় আমাদের থাকতে হবে পরিষ্কার পরিছন্ন। 

 

যক্ষ্মা

“যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই” আমাদের সমাজে অনেক আগে এই প্রবাদের প্রচলন ছিল। যক্ষ্মা হয়েছে এমন কেউ থাকলে তাকে একঘরে করে রাখা হত। কিন্তু কি ছিল এই যক্ষ্মা? চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয়ে থাকে টিউবারকিউলোসিস বাংলায় যাকে আমরা যক্ষ্মা হিসেবে জানি, এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি যা সাধারণত ফুসফুসকে আক্রান্ত করে থাকে। তবে ফুসফুস ছাড়াও যক্ষ্মা হতে পারে আমাদের মস্তিষ্কে, হৃৎপিণ্ডে, অগ্নাশয়ে এমনকি কিডনী পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে এই রোগে। প্রাণঘাতী এই সংক্রামক ব্যাধিটির জন্য দায়ী মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস  নামক একটি জীবাণু। 

সাধারণত ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীর সন্ধ্যা বেলায় প্রচন্ড জ্বর আসে, দীর্ঘদিন ধরে কাশি থাকে, কাশির সাথে কফ আসবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্তও আসতে পারে। আক্রান্ত রোগী ক্ষুধা মদ্দায় ভোগে, অনেক খাবার খাওয়ার পড়েও রোগীর শরীর শুকিয়ে যাবে এবং রোগীর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।

জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেই যে যক্ষ্মা হবে এমনটা কিন্তু না, এই জীবাণু দীর্ঘদিন ধরে আপনার শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে, এমনও হতে পারে কোনো প্রকার লক্ষণ প্রকাশ করা ছাড়াই আপনি হয়ত একে বহন করে চলেছেন । বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক তথ্যনুযায়ী বর্তমানে বিশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এই জীবাণুকে কোনো প্রকার লক্ষন ছাড়াই বহন করে চলেছে এবং মাত্র ৫-১০% মানুষ তাদের জীবদ্দশায় এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ করে থাকেন এবং তখন অন্যকে সংক্রমিত করে নিজের অজান্তেই যার জন্য এটি হতে পারে মৃত্যুর কারণ। 

দীর্ঘদিন এই জীবাণু মানুষের শরীরে সুপ্তাবস্থায় ত্থাকাটা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে, অনেকেই মনে ৭০ হাজার বছর আগের এই জীবাণু দ্বারা আমরা কোন না কোন ভাবে উপকৃত হয়ে থাকি এবং শুধু মাত্র যাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তারাই এই রোগে ভুগে থাকেন অথবা মৃত্যু বরণ করে থাকেন। গবেষকেরা ধারণা করছেন যদি যক্ষ্মা রোগের বিবর্তনের ইতিহাস জানা যায় তাহলে এই রোগের জন্য নতুন ওষুধ এবং টিকা উদ্ভাবন সহজ হবে তখন এখনকার মতো দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন হবে না। 

 

নিউমোনিয়া

নিউমোনিয়া হয়ত গুটিবসন্ত , ম্যালেরিয়া অথবা যক্ষ্মার মতো ভয়ংকর না তবে এটাও মরণঘাতী হতে পারে ৬৫ বছরের বেশী বয়সের এবং ৫ বছরের কম বয়সের শিশুদের জন্য। এটি শ্বাসতন্ত্রের একটি রোগ, সাধারণত সংক্রমণ হয়ে থাকে স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি নামক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে যা ফুসফুসের বায়ু থলিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। সারাবিশ্বে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একটি শিশু মারা যাচ্ছে শুধু মাত্র নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে এবং প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ২২০০ শিশু। ২০১৭ সালে সিডিসি এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় শুধু মাত্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।  ২০১৮ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডায়রিয়ার কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪৩৭০০০ জন এবং ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হয়ে ২৭২০০০ জন শিশু মারা গেছে কিন্তু নিউমোনিয়া তে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ শিশু। 

নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলি সাধারণত ঠান্ডা বা ফ্লু এর মতোই হয়ে থাকে, সাধারণ ফ্লু এর লক্ষন গুলির পাশাপাশি বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, অবসাদ, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, নবজাতক বা শিশুদের ক্লান্ত এবং শক্তিহীন দেখা যাওয়া, খাবারে অরুচি, খেতে না চাওয়া বা কষ্ট হওয়া এবং কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা এর প্রধান লক্ষণ। 

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর দিকে দিয়ে বিশ্বের ১৫ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪ তম, এবং তালিকায় ২য় স্থানে রয়েছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও ৩য় স্থানে পাকিস্তান। তাই অন্যান্য সংক্রামক রোগের পাশাপাশি নিউমোনিয়াকেও আমাদের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে, হয়ত আপনি বেঁচে যেতে পারেন কিন্তু আপনার বাসায় থাকা বৃদ্ধ মানুষটি অথবা আপনার ৪ বছরের শিশুটির জন্য এটি খুবই ভয়াবহ। 

 

জিকা ভাইরাস 

জিকা ভাইরাস হলো একটি ফ্লাভিভাইরাস যা এডিস গোত্রের মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্রথম পাওয়া যায় আফ্রিকাতে, ১৯৪৭ সালে।  যদিও জিকা ভাইরাসজনিত রোগটি বেশিরভাগ মানুষের জন্য তেমনভাবে বিপজ্জনক নয়, কিন্তু এটি ভ্রূণ এবং নবজাতকের জন্য মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সিডিসির মতে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত পাঁচ জনের মধ্যে একজন অসুস্থ হয় এবং লক্ষণ প্রকাশ করে।। 

যারা অসুস্থ হয়ে পড়ে তাদের জ্বর, ফুসকুড়ি, জয়েন্টে ব্যথা এবং কনজেক্টিভাইটিস (গোলাপী চোখ) হতে পারে। এই লক্ষণগুলি সাধারণত হালকা এবং অল্পকিছু দিন স্থায়ী হয় কিন্তু ভ্রূণ এবং নবজাতকের গুরুতর যে জন্মগত ত্রুটিগুলি আছে বিশেষ করে মাইক্রোসেফালি এর সাথে জিকা ভাইরাসের সম্পর্ক আছে। জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে সমস্যা হতে পারে বিশেষ করে মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ বিকাশ হয় না, যেটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে মাইক্রোসেফালি নামে পরিচিত। 

২০১৫ সালে ব্রাজিলে কয়েক হাজার শিশু ছোট মাথা নিয়ে জন্মগ্রহন করে, তাদের মাথা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক ছোট। গবেষণায় সুনির্দিষ্ট তেমন কোনো প্রমাণ না থাকলেও অনেক চিকিৎসাবিদের ধারণা এটি জিকা ভাইরাসের জন্য হতে পারে, কারণ সেসময় জিকা ভাইরাস ব্রাজিল সহ দক্ষিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে মহামারী আকারে দেখা দিয়েছিল। প্যান আমেরিকান স্বাস্থ্য সংস্থা দাবি করেছে যে, জিকা ভাইরাস গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে গর্ভপাতের জন্য দায়ী থাকতে পারে।  

জিকা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে এমন একটি প্রমাণ পেয়েছে সিডিসি এর বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৫ এর শেষের দিকে যৌনসংগমের মাধ্যমে জিকা ভাইরাস ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে যেখানে মহিলাটি ভেনিজুয়েলা থেকে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। যদি বাংলাদেশে এর প্রাদুর্ভাব তেমন একটা দেখা যায় নি তবুও আমাদের সতর্ক হবার বিকল্প নেই। এই ভাইরাস প্রাণঘাতী না হলে আপনার গর্ভজাত শিশুর জন্য অবশ্যই ভয়ংকর। মশা থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখা হলো এই ভাইরাস থেকে প্রতিকারের অন্যতম উপায়, পাশাপাশি ঘর বাড়ি মশা মুক্ত রাখতে হবে, ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার রাখতে হবে এবং মশারি ব্যবহার করতে হবে। 

 

হাম 

সংক্রামক রোগগুলির মধ্যে সবচেয়ে সংক্রামক হলো হাম, চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাম রুবেলা নামেও পরিচিত কারণ এটির জন্য দায়ী হলো রুবেলা ভাইরাস। শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো হাম, প্রচন্ড জ্বরের পাশাপাশি এটি ত্বকে একধরণের লাল ফুসকুড়ি সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়। তাছাড়া এই রোগের অন্যান্য লক্ষণগুলির সাথে সাধারণ সর্দির সাথে মিল রয়েছে। সিডিসি এর এক গবেষণায় পাওয়া যায়, হাম এতটাই ছোঁয়াচে যে যেসব মানুষ ভাইরাস আক্রান্ত নিকট শুধুমাত্র দাঁড়িয়ে থাকে তাদের ৯০ শতাংশই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।  

লাইভ মেডিসিনের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গণ সমাবেশমূলক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং হারবার্ট ওয়ার্টহিম কলেজ অফ মেডিসিনের প্রফেসর অ্যাইলেন বলেন যে, হাম আক্রান্ত ব্যাক্তি ৫০ ফুট দুরত্বের মধ্যে এমনকি সে যেই ঘরে ছিল সেই ঘর থেকে বের হয়ে যাবার দুই ঘন্টা পড়েও যদি কেউ ঘরে প্রবেশ করে তাহলে তার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা থাকে।  আমাদের সৌভাগ্য আমরা এই ভয়ানক ব্যাধির প্রতিষেধক পেয়েছি, প্রতিষধক নেওয়া প্রতি ১০০০ জনের ৯৯৭ জন এই রোগে আক্রান্ত হয় না। তাই শিশু জন্মের পর অবশ্যই হামের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। 

হাম আক্রান্ত রোগীকে পুরোপুরি বিশ্রামে থাকতে হয়, যেহেতু এটি ছোঁয়াচে সেহেতু এ সময় বাসা থেকে বের হওয়া উচিত না এবং রোগীর সবকিছু আলাদা করে রাখতে হবে। রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি করাতে হবে এবং স্বাভাবিক স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি রোগীকে বেশি বেশি তরল খাবারও খাওয়াতে হবে। হামে আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত পরিষ্কার পানিতে গোসল করাতে হবে। সাধারণত তিনদিনের চিকিৎসাতে জ্বর কমে যায় এবং ৭ দিনের চিকিৎসাতে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।

 চলবে... 

 

 

 

Default user image

মোঃ ইকবাল হোসেন নয়ন, লেখক, আস্থা লাইফ

লিখতে পছন্দ করেন। সাধারণত তিনি তার কল্পনা থেকে কবিতা, রম্যরচনা এবং বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলি সম্পর্কে লেখালেখি করে থাকেন। তার পছন্দের একটি কাজ ব্লগে লেখা এবং অতীতে তার লেখা কিছু অনলাইন ভিত্তিক ম্যাগাজিনে প্রকাশ হয়েছে। তিনি এখন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এর ফার্মাসি বিভাগে স্নাতকোত্তর এ অধ্যয়নরত আছেন। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার স্নাতক শেষ করেছেন। ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত লেখায় তাঁর আগ্রহ এখন প্রবল। তিনি অবসর সময়ে গান শুনতে এবং বই পড়তে পছন্দ করেন। সাধারণত লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ বই এবং ব্লগ পড়া থেকে আসে। তাঁর প্রিয় বইগুলির মধ্যে রয়েছে ভ্রমণকাহিনী, কিছু কবিতার বই এবং সায়েন্সফিকশন যা তাকে তাঁর কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। লেখালেখি করার জন্য তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো সোশ্যাল সাইটগুলি, যেখানে সে নিজের লেখা লিখতে পারে।