পৃথিবী পাল্টে দেয়া কিছু মরণঘাতী রোগ! ৪র্থ ও শেষ পর্ব- ভাইরাল ডায়রিয়া, বার্ড ফ্লু , এইডস, জলাতঙ্ক এবং সিফিলিস

ভাইরাস নামের এমন অদেখা জীবের সুত্রপাত কিন্তু আমাদের জন্য নতুন নয়, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে ৩০০০ বছর আগেও ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ ছিল, সেসব রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারাও যেত। আমাদের দেশে আগে কলেরার মহামারীতে অনেক মানুষ মারা গিয়েছে। এছাড়াও আমাদের ইতিহাসে বলা আছে যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া সহ আরও কত মাহামারীর নাম যারা এইসব অণুজীবের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই ধারাবাহিকভাবে সেইসব কিছু মহামারী বলব। ধারাবাহিক ভাবে আজ ৪র্থ ও শেষ পর্বে থাকছে শিশুদের মারাত্মক রোটা ভাইরাল ডায়রিয়া, বার্ড ফ্লু , এইডস, জলাতঙ্ক এবং সিফিলিস নিয়ে আলোচনা।

মহামারী এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে প্রথম পর্বে আমরা জেনেছিলাম গুটি বসন্ত, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, জিকা ভাইরাস এবং হামের ভয়াবহতা। জেনেছিলাম স্প্যানিশ ফ্লু সম্পর্কে, মহামারী এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে। তৃতীয় পর্বে ছিল কলেরা, অ্যানথ্রাক্স, পীত জ্বর, ডেঙ্গু, এবং প্লেগ নিয়ে বিস্তারিত। সেই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্বে আরও কিছু মারাত্মক মহামারি নিয়ে আলোকপাত করব।

 

রোটা ভাইরাল ডায়রিয়া 

সাধারণত আমাদের যে ডায়রিয়া হয়ে থাকে তা ব্যাকটেরিয়ার কারণে, কিন্তু রোটা ভাইরাল ডায়রিয়া হয় রোটা ভাইরাসের আক্রমণে। এই ভাইরাস শীতকালে সক্রিয় থাকে এবং শিশুদের শীতকালের ডায়রিয়ার জন্য এই ভাইরাসকেই দায়ী করা হয়। এই সময় আপনার একটু অসাবধানতায় আপনার শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। 

রোটা ভাইরাসে সংক্রমণ হওয়ার দুই থেকে তিন দিন পরই উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। প্রথমে শিশুর বমি হয় অনেক, এরপর ধীরে ধীরে পানির মত পাতলা পায়খানা দেখা দেয় আর এই ডায়রিয়া খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তীব্র আকার ধারণ করে। ৭ দিন ধরে স্থায়ী হতে পারা এই ডায়রিয়ায় পায়খানার সাথে প্রচুর পানি বের হয়ে যাওয়ায় শিশু পানি শূন্যতায় ভোগে এবং এত বেশী পানি শূন্যতা দেখা দেয় যে শিশু একসময় মারা যায়। 

সারা বিশ্বে প্রতিবছর এই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৬ লাখেরও বেশী শিশু মারা যায়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ লক্ষ শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং মারাত্মক সংক্রমনে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ শিশু মারা যায়। তাই শিশুদের খুব সাবধানে রাখতে হবে। 

সাধারণত খাবারের সাথে ভাইরাস শিশুদের শরীরের ভেতর যায় এবং সংক্রমণের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। যেহেতু শিশুদের যেকোনো কিছু মুখে দেওয়ার প্রবণতা থাকে সেহেতু এই ভাইরাস শিশুদের খেলনা, খাবার পানি  বিভিন্ন আসবাবপত্রের মাধ্যমেও শিশুদের সংক্রমমিত করতে পারে। পানি শূন্যতা এই ভাইরাসের প্রধান লক্ষণ, তাই পানির ঘাটতি পূরণ করার জন্য আক্রান্ত শিশুকে প্রচুর স্যালাইন এবং তরল খবার খাওয়াতে হবে।

 

বার্ড ফ্লু

বার্ড ফ্লু, নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি ফ্লু জাতীয় কোনো রোগ এবং পাখিদের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। বার্ড ফ্লুকে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জাও বলা হয়ে থাকে। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ৪ টি প্রজাতি আছে এইচ৫এন১, এইচ৭এন৭, এইচ৭এন৩ এবং এইচ৯এন১ এবং এদের মধ্যে এইচ৫এন১ ভাইরাসকেই মূলত বার্ড ফ্লু এর জন্য দায়ী মনে করা হয়।  বন্য প্রজাতির পাখিদের মধ্যে যারা সাধারণত জলচর হয়ে থাকে তাদের মধ্যে এই ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং এই ভাইরাসের বাহক কোনো পাখি যখন গৃহপালিত পাখি যেমন হাঁস, মুরগী, কবুতর এদের সংস্পর্শে আসে তখন তাদের মধ্যেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত শীতকালে অতিথি পাখিরা যখন আমাদের দেশে আসে তখন বার্ড ফ্লু ছড়ানোর সম্ভবনা বেশী থাকে। 

১৮৭৮ সালের দিকে এই ভাইরাসের প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় এবং আগে মনে করা হতো এই ভাইরাস শুধুমাত্র পাখিদেরই সংক্রমিত করে কিন্তু ১৯৯৭ সালের দিকে প্রথম মানুষের দেহে এই ভাইরাসের খোজ মিলে এবং সেসময় থেকে এই ভাইরাসকে মানুষের জন্যও ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০০৭ সালের দিকে আমাদের দেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ লক্ষ্য করা হয়। 

পাখিরা দ্রুত এক স্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যেতে পারে তাই এর সংক্রমণও খুব দ্রুত হয়, এই ভাইরাস পাখিদের লালা ও মলের মধ্যেম বিস্তার লাভ করে এমনকি আক্রান্ত পাখির ডিম থেকেও ছড়াতে পারে এই বার্ড ফ্লু।  তীব্র জ্বরের সাথে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যাওয়া, কফের সাথে রক্ত আসা, পানির মত পাতলা পায়খানা হওয়া, শ্বাস নিতে কষত হওয়া এবং বুকে ব্যাথা করা সহ সাধারণ ফ্লু এর লক্ষণ দেখা দেয় আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে। 

বার্ড ফ্লু থেকে প্রতিকার পেতে আমাদের আগে আক্রান্ত পাখি চিনতে হবে এবং সেই পাখির মাংস ডিম খাওয়া যাবে না। বার্ড ফ্লু তে আক্রান্ত মুরগীর পালক অমসৃণ হয়ে যায়, ডিম দেওয়া কমিয়ে দেয়, মুরগীকে ঝিমাতে এবং মুরগী অস্বাভাবিক ভাবে হাঁপাতে থাকে। 

বার্ড ফ্লু প্রতিরোধে ভোক্তাদের থেকে খামারিদের সচেতন হতে হবে বেশী, কারণ বিশ্বে বার্ড ফ্লু আক্রান্ত হয়ে যতগুলো মৃত্যু হয়েছে তার ৯৫ শতাংশই খামারি। নিজের খামারকে বার্ড ফ্লু মুক্ত রাখতে হলে জীবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

খামারের হাঁস-মুরগি সব সময় ভালো ও পরিষ্কার জায়গায় রাখতে হবে, প্রবেশাধিকার ও অন্যান্য প্রাণির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে কারণ দর্শনার্থীদের মাধ্যমে এই ভাইরাস আক্রান্ত এক খামার থেকে অন্য খামারে অথবা আক্রান্ত এলাকা থেকে খামারে রোগ ছড়াতে পারে। তাছাড়া ছাগল ভেড়ার মতো প্রাণীও তাদের শরীরে করে এই ভাইরাস খামারে বহন করে নিয়ে আসতে পারে। খামারিদের অধৈর্য না হয়ে ঠান্ডা মাথায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং আক্রান্ত পাখি কোনোভাবেই বিক্রি করা যাবে না। আমরা যারা ভোক্তা তাদের অবশ্যই মাংস ডিম খাওয়ার আগে ভালো করে সেদ্ধ করতে হবে এবং চাইলে হাল্কা ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি দিয়ে ডিম ধুয়ে ফ্রিজে সংরক্ষন করে রাখতে পারবেন।  

 

এইডস

আজকে আমরা মরণব্যাধী এইডস সম্পর্কে অনেক কিছু জানি, কীভাবে ছড়ায় এই রোগ, এই রোগ হলে কি হয় আর কেনই বা একে মরণব্যাধী নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে কোনো কিছুই আজ আমাদের কাছে অজানা নয়। আমরা আজকে এই এইডস এর ব্যাপারে অনেকখানি সচেতন কারণ এই যে এইচআইভি ভাইরাসের (হিউম্যান ইমিউনোডিফিসিয়েন্সি ভাইরাস) কারণে এই রোগ ছড়ায় সেটা এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। 

আমাদের ভাগ্য এতই সুপ্রসন্ন যে এই ভাইরাস ছোঁয়াচে নয়, মানুষে মানুষে সংস্পর্শে এই রোগ ছড়ায় না, এই রোগ ছড়ায় অবাধ যৌনমিলনের ফলে, এই রোগ ছড়াতে পারে এইচআইভি পজিটিভ এমন কারো থেকে রক্ত নিলে এমনকি এইচআইভি পজিটিভ মায়ের বুকের দুধ শিশু পান করলেও শিশুটি এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।  

মানব রক্তে প্রথম এইচআইভি সনাক্ত হয় ১৯৫৪ সালে, এর পর কত যুগ পার হয়ে গেলেও এখনও এই ভাইরাস চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিচ্ছি, এই রোগের পেছনে যত শ্রম ও অর্থ দেওয়া হয়েছিল আর কোনো রোগের পেছনে মনে হয়না দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৫০ বছর আগে যখন মার্কিন গবেষকরা এই ভাইরাসের প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন তখন শুধু তারা অসহায়ের মতো দেখেছেন কীভাবে একজন প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর মানুষ এই ভাইরাসের সংক্রমণে ধীরেধীরে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন এবং চলে যাচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। 

আসলে তখন ডাক্তারপ্রা জানতেন না এই ভাইরাস কেন এতো রহস্যময়, কি করছে সে আমাদের শরীরের ভেতরে, কেনই বা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে কিছু করতে পারছে না, কোথা থেকে এই ভাইরাস ধ্বংসযজ্ঞয় শুরু করে।  এই ভাইরাস আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা বের করতে পেরেছিলেন এর উৎস এবং কর্মপ্রক্রিয়া। 

হাজারো মানুষের জেনেটিক বিশ্লেষণ করে তারা প্রমাণ পেয়েছেন সর্বপ্রথম এইডস দেখা দেয় ১৯২০ সালে আফ্রিকার বেলজিয়ান কঙ্গোর রাজধানী কিনসাসা থেকে।  কিন্তু এটা ওইখানেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, কিনসাসা অনেক জনপ্রিয় একটি শহর হওয়ায় এখানে আসা পর্যটকের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। 

তখনো এই ভাইরাসের প্রকোপ একটুও বোঝা যায় নি, কারণ এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ২০ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে অর্থাৎ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ১০-২০ বছর আপনি কোনো লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারবেন। মূলত এই ভাইরাসের বিস্ফোরণ শুরু হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৭০ সালে যখন ইউরোপ আমেরিকার কয়েকটি দেশে যৌন স্বাধীনতা এবং সমকামিতা নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল ঠিক তখন এই ভয়ানক এইচআইভি আরেকবার সুযোগ পেয়ে যায় নিজের ক্ষমতা দেখানোর জন্য এবং খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিলো ইউরোপ এবং আমেরিকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শুধু মাত্র আমেরিকাতেই মৃত্যু সংখ্যা ছিলো প্রায় ৫০ হাজার। 

২০০৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ৫ লাখ আক্রান্ত হওয়ার বিপরীতে ৫৮ হাজার মৃত্যু হয়েছে এইডসের কারণে এবং আমেরিকায় আক্রান্ত হয়েছিলো প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ। সারাবিশ্বে প্রতিদিন এই ভাইরাসে ৬ জন আক্রান্ত হন যাদের অধিকাংশই কিশোর বয়সের ছেলে মেয়ে এবং ইউএনএফপিএর এক জরিপে আরো জানা যায়, বর্তমানে পনেরো থেকে পঁচিশ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশ এইচআইভি পজিটিভ যার মধ্যে ৬২ শতাংশ হচ্ছে নারী। 

আমাদের দেশেও এইডস রোগী দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই একে এখন অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই,  কারণ দারিদ্র, শিক্ষার অভাব, অবাধে যৌন মিলন, পরকীয়ার মতো এইচআইভি সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সকল অবস্থাই বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এইডস এর রোগী সনাক্ত হয়েছে ৮৬৫ জন যাদের মধ্যে ৩৮০ জন পুরুষ এবং ৮১ জন ছিলেন নারী। 

ইউনিসেফ এবং ইউএনএইডস এর এক জরিপে বাংলাদেশে বর্তমানে এইডস এর রোগী আছে প্রায় ১৩ হাজার।  এক জরিপে প্রমাণ পাওয়া যায় ঢাকার বস্তি এলাকায় যারা থাকে তাদের মধ্যে কিশোর বয়সের ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই যৌন মিলনের অভিজ্ঞতা রয়েছে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যেই, তাদের মধ্যে বড় হয়ে কেউ হয়ে যাচ্ছে যৌনকর্মী, কেউ চাকরী খুঁজে নিচ্ছে গার্মেন্টস সেকটর গুলোতে সেখানেও অবাধ যৌনাতায় এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এফপিএবির পরিচালিত এক জরিপে উল্লেখ করা রয়েছে যে ৬৯ শতাংশ ট্রাক ড্রাইভার ও রিকশাচালক যৌনকর্মীদের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়ে থাকে যাদের মধ্যে বেশীরভাগ ট্রাক ড্রাইভার এবং রিকশাচালকই বিবাহিত এবং পতিতাগুলোতে কনডম ব্যাবহারের হার সবচেয়ে কম থাকায় খুব সহজেই তারা এইডস এর জীবাণু বহন করে ঘরে নিয়ে যেতে পারে। ছোঁয়াচে না হলেও শুধু মাত্র এইডসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে যাদের মধ্যে ৫ লাখই শিশু।

এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হল বিবাহবহির্ভূত নারী পুরুষের অবাধ সম্পর্ক থেকে সরে আসা যা এই রোগের প্রধান কারণ, এছাড়াও রক্ত গ্রহণ করার আগে রক্ত দাতার রক্ত পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। কিশোর বয়স থেকেই ছেলে মেয়ে উভয়কে সুষ্ঠ যৌন শিক্ষা দেওয়া উচিৎ, তাদের বুঝানো উচিৎ এই রোগ সম্পর্কে, কারণ বয়ঃসন্ধি কালের একটি ভুল মরণ ডেকে আনতে পারে, বাঁচতে হলে অবশ্যই জানতে হবে। 

 

জলাতঙ্ক

বাংলাদেশের অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা এই জলাতঙ্ক, বিভিন্ন প্রকার জীব জন্তুর মাধ্যমে এই রোগ ছড়ানোর প্রমাণ মিললেও আমাদের দেশে শতকরা ৯১ ভাগ জলাতঙ্ক হয়ে থাকে কুকুরের কামড়ের ফলে। কুকুরের অথবা অন্যান্য প্রাণীর মুখের লালায় রেবিস ভাইরাস নামক এক অণুজীবের কারণে এই রোগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই রোগ যেকোন প্রাণিরও হতে পারে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত প্রাণির নখের আচড়ে অথবা কামড়ের ফলে গবাদি পশুতেও এই রোগ ছড়াতে পারে।

অতীতে এই রোগের কোনো প্রতিষেধক ছিল না, পরবর্তীতে বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর এই রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন ১৯৮৫ সালে। এখন জলাতঙ্ক অস্তিত্ব বিশ্বব্যাপী, শুধু মাত্র আমেরিকায় এর প্রভাব খুব কম। প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজারেও বেশী মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, এর মধ্যে ৫৬ শতাংশই আমাদের এশিয়া মহাদেশে মারা যায়, যার মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশী মানুষ শুধুমাত্র প্রতিবেশী দেশ ভারতে মারা যায়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই হাজারেরও বেশি মৃত্যু হয় এই জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে। কেউ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হলে এই রোগীর মধ্যে প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা খুব কষ্টসাধ্য, সাধারণত আক্রান্ত ব্যাক্তির মধ্যে হালকা জ্বরের পাশাপাশি সাধারণ সর্দি কাশির লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং শরীরে দুর্বলতা অনুভত হয়। কিন্তু সিডিসি এর বিবৃতি অনুযায়ী জলাতঙ্কের অন্যতম লক্ষণ গুলি হল, রোগীর অস্বাভাবিক আচরণ, স্নায়ু দুর্বলতা, তার আশেপাশে সবসময় কিছু ঘটছে অলৌকিক এমন মনে করা (Hallucination) এবং অনিদ্রা অনুভব করা।

এই রোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে কুকুর বা অন্যান্য প্রাণি কামড়ানোর পর ক্ষতস্থানে সাথে সাথে এন্টিসেপ্টিক দ্বারা ধৌত করা হলে এবং সঠিক প্রতিষেধক নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব খুব সহজেই, অন্যথায় মৃত্যু শতভাগ নিশ্চিত।

 

সিফিলিস 

সিফিলিস একটি ব্যাকটিরিয়া ঘটিত সংক্রমণ যা অসুরক্ষিত যৌন মিলনের সময় আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীর থেকে সুস্থ ব্যাক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, সিফিলিস ট্রেপোনেমা পেলিডাম (Treponema pallidum) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হয় এবং আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে এই জীবাণু ৯-১০ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। এই রোগের প্রথম লক্ষণ প্রকাশ হতে প্রায় ১৪ থেকে ২৮ দিন লাগতে পারে, তাই সহজেই আক্রান্ত ব্যাক্তির চোখ এড়িয়ে যায় এই রোগ।

সিফিলিস সংক্রমনের প্রধান কারণ হিসেবে অসুরক্ষিত যৌন সংস্পর্শ হলেও বিশেষজ্ঞরা সিফিলিস আক্রান্ত ব্যাক্তির রক্ত, তার সাথে চুম্বন, তার শরীরে কোথাও ঘা হলে এমনকি গর্ভবতী মায়ের কাছ থেকেও ভ্রূনে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন প্রমাণ পেয়েছেন। 

সিফিলিসের নির্দিষ্ট কোনো উপসর্গ নেই, এর উপসর্গগুলোকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা যায় যেমন প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে ব্যাথাহীন ক্ষুদ্র ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং ব্যাকটেরিয়া যে স্থানে প্রবেশ করেছিলস সেই স্থানে কালচে দাগ হয়ে যায়। এই ক্ষত ব্যাথাহীন হওয়ায় আক্রান্ত ব্যাক্তির অগোচরেই থেকে যায় কারণ এটি লুকিয়ে থাকতে পারে যোনি পথে অথবা মলদ্বারে। এরপরে এক সপ্তাহের মধ্যেই মাধ্যমিক পর্যায়ের লক্ষণ প্রকাশ পায়, সে সময় আক্রান্ত ব্যাক্তির পুরো শরীরে এমনকি হাত পায়ের তালুতেও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এই ফুসকুড়ি সাধারণত চুলকায় না তাই আক্রান্ত ব্যাক্তি ধরেই এগুলো নিজেনিজেই চলে যাবে আর সেখানেই করে ভুল।

প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ ব্যাক্তি অবহেলা কারণে চলে যায় বিপজ্জনক পর্যায়ে। তখন এই ব্যাকটেরিয়া চলে যেতে পারে লিভারে, হার্টে, হাড়ে, পাকস্থলীতে, চোখে এবং স্নায়ু কোষে। এই পর্যায় পর্যন্ত আসতে প্রায় ১ বছর অথবা তার অধিকও লাগতে পারে কিন্তু ততদিনে আর কিছুই করার থাকে না। 

চতুর্থ অথবা অন্তিম পর্যায়ে এসে এই রোগ আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, শুরু হয় হৃদপিণ্ডে জ্বালা পোড়া, নষ্ট হয়ে যায় যকৃত বা লিভারের কার্যক্ষমতা, স্নায়ুকোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং শরীরের কিছু অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (Paralyzed) পড়ে, আক্রান্ত ব্যাক্তির দৃষ্টিশক্তি কমে যায় এমনকি অন্ধ হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। সিফিলিস অনেকটা আমাদের শরীরে স্লিপার সেল হিসেবে বসে থাকে, সময় বুঝে শরীরে আঘাত হানে, তাই আমাদের সবারই সচেতন হতে হবে কারন সচেতনতাই সিফিলিস থেকে পরিত্রানের উপায়।  

 

কোভিড-১৯ সারা বিশ্বে আজ আতঙ্কের নাম, এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে সংক্রমিত হয়ে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ, মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে এক লক্ষ। একটা ভাইরাসের মহামারী কতটা ভয়াবহ হতে পারে নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে গেলো বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববাসী। যুগে যুগে আরো মহামারী এসেছে, ইতিহাস ঘাটলে পাওয়া যাবে মহামারী প্লেগ থেকে দিয়ে শুরু আজকের এই কোভিড-১৯ পর্যন্ত প্রতি শতাব্দিতেই একটা মহামারী ছিলো আমাদের এই পৃথিবীতে।

কোভিড-১৯ এর ছাড়াও আরো কিছু সংক্রামক রোগ যেগুলো হয়তো এখন নেই কিন্তু ফিরে আসতে পারে যেকোনো মুহূর্তে অথবা কিছুকিছু এখনো রয়েছে ধারণ করতে পারে আবার মহামারী রুপে তাদের সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে আমাদের এই সংক্রামক রোগ নিয়ে ধারাবাহিক চারটি পর্বে। নিজে সচেতন হউন, সুস্থ থাকুন এবং অন্যকে সচেতন করুন, সুস্থ রাখুন। 

 

Default user image

মোঃ ইকবাল হোসেন নয়ন, লেখক, আস্থা লাইফ

লিখতে পছন্দ করেন। সাধারণত তিনি তার কল্পনা থেকে কবিতা, রম্যরচনা এবং বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলি সম্পর্কে লেখালেখি করে থাকেন। তার পছন্দের একটি কাজ ব্লগে লেখা এবং অতীতে তার লেখা কিছু অনলাইন ভিত্তিক ম্যাগাজিনে প্রকাশ হয়েছে। তিনি এখন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এর ফার্মাসি বিভাগে স্নাতকোত্তর এ অধ্যয়নরত আছেন। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার স্নাতক শেষ করেছেন। ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত লেখায় তাঁর আগ্রহ এখন প্রবল। তিনি অবসর সময়ে গান শুনতে এবং বই পড়তে পছন্দ করেন। সাধারণত লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ বই এবং ব্লগ পড়া থেকে আসে। তাঁর প্রিয় বইগুলির মধ্যে রয়েছে ভ্রমণকাহিনী, কিছু কবিতার বই এবং সায়েন্সফিকশন যা তাকে তাঁর কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। লেখালেখি করার জন্য তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো সোশ্যাল সাইটগুলি, যেখানে সে নিজের লেখা লিখতে পারে।