১-২ বছর বয়সী শিশুদের কি খাওয়াবেন? বিশেষজ্ঞ মতামত
শিশুদের খাবার নিয়ে মায়েদের চিন্তার শেষ নেই। পুষ্টি ঠিকমতো পাচ্ছে তো, খাওয়াতে কোন ভুল করছি না তো, আরো কতই না দুশ্চিন্তা। একজন বিশেষজ্ঞের পারামর্শ পেলে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া আর দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। শিশুদের বয়সভিত্তিক খাবারের তালিকা করে আমাদের এই আয়োজন।
হাঁটি হাঁটি পা পা
যেথা খুশি সেথা যা।
হাসি খুশি মেখে থাক
দুধে ভাতে সুখে থাক
আমার ঘর ভরে থাক,
আমার পৃথিবী জুড়ে থাক।
এক বছর বয়সী ছোট্ট সোনামনির সাথে মায়েদের আদর এবং আবেগের জায়গাটা অনেকটা এমনই। এ বয়সে শিশুরা এ পা, দু পা করে হাঁটতে শেখে। তাদের মুখে শোনা যায় ছোট ছোট মিষ্টি বুলি। নতুন নতুন কার্যকলাপ আর খেলাধুলায় ঘরটাকে মাতিয়ে রাখে। আর এ সবই সঠিক বিকাশের এবং সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার লক্ষ্মণ। কিন্তু এসবের কোন কমতি হলে মায়ের বুকটা ভারি হয়ে ওঠে। ভয় পেতে শুরু করেন মায়েরা। শিশুর পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপই মায়েদের জন্য স্পর্শকাতর। এ সময়ে মায়েরা তাদের সন্তানকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন- সব ঠিকঠাক আছে কি'না।
কারণ সময়গুলো যে শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ! আর সঠিক বিকাশ এবং বেড়ে ওঠায় সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টি সবচেয়ে বেশী জরুরী। আর একারণেই মায়েরা জানতে চান তাদের কি করণীয়। আস্থা রাখতে চান বিশ্বাসযোগ্য কোন মাধ্যমের উপর। আর সেই আস্থা ধরে রাখতেই আমাদের আস্থা ব্লগ।
"শিশুদের খাদ্য তালিকা। কি খাওয়াবেন, কি খাওয়াবেন না" সিরিজটি পর্ব আকারে সাজানো হয়েছে ০ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। এ পর্যায়ে তৃতীয় পর্বে আমরা আলোচনা করব এক বছর থেকে ২ বছর বয়সী শিশুর খাদ্য তালিকা, করণীয় এবং বর্জনীয় কিছু বিষয় নিয়ে।
১-২ বছর বয়সী শিশুদের খাবার নিয়ে মায়েরা যে প্রশ্নগুলো করেন
-
এ বয়সে কি কি খাওয়ানো যেতে পারে?
-
বড়দের খাবার কি খাওয়ানো যাবে?
-
দিনে কয়বার খাওয়াতে হবে?
-
পরিমাণ কতোটুকু হবে?
-
রুটিনটা কেমন হবে?
এমন আরো হাজারো প্রশ্ন। চেষ্টা করব একটি সামগ্রিক ধারনা দিয়ে যেতে।
পরামর্শ দিয়েছেন
ডাঃ রানা কুমার বিশ্বাস
এমবিবিএস,বিসিএস (হেলথ), ডিসিএইচ, এফসিপিএস (শিশু),
এমডি (শিশু গ্যাস্ট্রোঃ) বিএসএমএমইউ (পিজি হাসপাতাল)
সিনিয়র কনসালটেন্ট ( শিশু)
২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, খুলনা।
তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী এই প্রবন্ধটি লেখা হলো।
১-২ বছর বয়সী শিশুকে কি খাওয়াবেন?
-
এ বয়সী শিশুকে দিনে কমপক্ষে পাঁচ বার মূল খাবার খাওয়াতে হবে।
-
এছাড়াও শিশু যতোবার দুধ খেতে চাইবে ততোবার দুধ খাওয়ানো যাবে।
-
এ বয়সে শিশুদের জন্য আলাদা খাবার রান্না না করে পারিবারিক খাবার খাওয়ালে খাবারে বৈচিত্র্য থাকবে।
-
তবে বিশেষ কিছু খাবার খাওয়ানো হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেমন- ডিম, বাদাম, ফল, সবজি, মাছ, মাংস, বিভিন্ন রকম ডাল। এসকল খাবার তার খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।
তারপরেও নতুন মায়েদের বুঝতে সুবিধার জন্য একটি খাদ্য তালিকা তুলে ধরা হলো।
সকালের খাবার
-
সিরিয়াল/ সুজি রান্না / ভেজানো নরম রুটি/ ভাত ও সবজি খাওয়াতে হবে।
-
মাঝে মাঝে পানি এবং দুধ চলবে। সর্বচ্চো দু ঘণ্টা পর ডিম খাওয়ানো যেতে পারে।
বেলা ১১-১২ টার খাবার
-
সকাল ১১-১২ টার মধ্যে তাকে একটা বা দুটো ফল দেওয়া যেতে পারে। যেমন কলা, পেঁপে, সফেদা, বেদানার রস, খেজুর, খেজুর রস করে ইত্যাদি।
দুপুরের খাবার
-
দুপুরে গোসলের পর ভাত/ খিচুড়ি, সবজি, ডাল, মাছ, মাংস অর্থাৎ ঘরে যেটা রান্না হয়েছে সেটাই খাওয়ান।
বিকাল ও সন্ধ্যার খাবার
-
বিকেলে ঘুম থেকে ওঠার পর নাশতায় সুজির হালুয়া, গাজরের হালুয়া, সিরিয়াল খাওয়াতে পারেন। হালুয়ার সাথে বাদামের গুড়ো মিশিয়ে দিলে তার পুষ্টি নিশ্চিত হবে।
-
সন্ধ্যায় দুধ খাবে।
রাতের খাবার
-
রাতে পরিবারের সাথে বসে ভাত তরকারী অথবা নরম করে রুটি খাবে।
অন্যান্য যে বিষয়গুলি খেয়াল রাখবেন
-
এ বয়সী শিশুদের রাতে ঘুমের মাঝে ক্ষুধা লাগে। তখন তারা কান্না করে বা ঘুমের মধ্যে অস্বস্তি প্রকাশ করে। তখন উঠিয়ে দুধ খায়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে।
-
এ বয়সের শিশু দুধের তৈরি মিষ্টি খাবার খেতে পছন্দ করে। তাকে এসব খাবার দেওয়া যাবে। এ বয়সে ছানার তৈরি মিষ্টি মাঝে মাঝে খাওয়ালে তার বুদ্ধি বৃদ্ধি পাবে।
-
তার হাতে মাঝে মাঝে ফল বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দেওয়া যেতে পারে। এতে করে সে নিজে খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে পারবে এবং তার সঠিক মানসিক বিকাশ ঘটবে।
-
এ বয়সে শিশুকে বড়দের সাথে খেতে ডাকলে তারা সামাজিক হয়ে উঠবে। খাওয়ার প্রতি অনীহা থাকবেনা।
শিশুকে কী খাওয়ানে উচিৎ নয়?
কিছু খাবার ১-২ বছর বয়সী শিশুকে খাওয়ানো উচিত নয়। লক্ষ্য করুন-
১. ফর্মুলা মিল্ক অবশ্যই রান্না করে খাওয়ানো যাবে না।
২. কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলো আয়রন জাতীয় খাবার যেমন আনার বা কাঁচা কলা খাওয়ানো যাবে না।
৩. বাইরের খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন।
৪. যদি গরুর দুধে এ্যালার্জি না থাকে তবে খাওয়ানো যেতে পারে কিন্তু পাতলা করে।
৫. কৌটাজাত ফুলক্রীম মিল্ক খাওয়ানো যাবে না।
৬. তিন বছর বয়সের আগে আঙ্গুর খাওয়ানো যাবে না।
৭. সে যেহেতু নতুন অনেক খাবারের সাথে পরিচিত হচ্ছে, খেয়াল রাখতে হবে কোনো খাবারে তার পেটে সমস্যা দেখা দেয় কিনা। তেমন হলে সেই খাবারটি অনতিবিলম্বে বন্ধ করে দিতে হবে।
৮. এমন কোনো খাবার হাতে দেওয়া যাবে না যেটা খেতে গিয়ে গলায় আটকে যায়। শিশুদের গলায় খাবার আটকে যাওয়াটা ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ।
৯. অতিরিক্ত খাওয়াবেন না।
১০. দিনে বেশী প্রজাতির ফল বা ডিম, দুধ, কলা, মাংস সব একবারে একদিনে খাওয়াবেন না।
১১. যেহেতু নতুন নতুন খাবার খাচ্ছে, পেটে গ্যাস তৈরি হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখবেন। পেটে গ্যাস থাকা অবস্থায় বেশী খাওয়াদাওয়া ক্ষতিকর। আগে গ্যাস নির্মূল করতে হবে।
১২. শিশুর হাতে অবশ্যই পরিষ্কার খাবার তুলে দেবেন। তার আগে তার হাত পরিষ্কার করে নেবেন।
১৩. এ বয়সে শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে, তাই খেয়াল রাখতে হবে তারা এমন কিছু খেয়ে ফেলছে কিনা যা তার জন্য ক্ষতিকর। যে খাবারটি তার জন্য ক্ষতিকর সেটা তাকে আড়াল করে খেতে হবে।
১৪. এ বয়সী শিশুর সামনে ওষুধ খেলে অবশ্যই সে ওষুধ শিশুর নাগালের বাইরে রাখতে হবে।
পরিশেষ
চেষ্টা করেছি ১-২ বছর শিশুর খাবার সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা প্রদান করতে যেন মায়েরা খানিকটা হলেও দিক নির্দেশনা পান। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। আগামী পর্বে কথা হবে ২- ৩ বছর বয়সী শিশুর খাদ্য তালিকা পাশাপাশি তার বাড়ন্ত শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় যত্ন কেমন হবে সে বিষয়ে।
