ঈদের খাবার খাওয়ার স্বাস্থ্যসম্মত ৫টি উপায়
আবার চলে এল আনন্দের দিন ঈদুল ফিতর। তবে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলে ঈদে অনেকেই অসুস্থ হয়ে যায়। আবার অনেকে আগেভাগে ওষুধ কিনে রাখে বিভিন্ন ধরনের অসুখ থেকে নিরাময়ের জন্যে। আমরা একটু চিন্তা করে সচেতনভাবে খাবার গ্রহণ করলেই কিন্তু সেইসব অনাহুত ঝামেলা থেকে বেঁচে থাকতে পারি।
ঈদে খাবার হোক নিয়মতান্ত্রিক, আনন্দ হোক বাঁধনছাড়া!
এইতো একদিন পরেই মুসলমানদের সবচেয়ে আনন্দের এবং উৎসবের দিন ঈদুল ফিতর। টানা এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের দিন সবাই নানান রকম খাবারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি! সারা মাস মনমত খাবার না খেতে পারার কারণে তা ঈদের যেন একেবারে পুষিয়ে নিতে চাই! ঈদের আনন্দে সব খাবারই আমাদের খেতে ইচ্ছা করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং বেশি বেশি খাওয়া বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। আর একমাস টানা রোজা রাখায় স্বাভাবিক ভাবেই খাবারের সময় সূচিতে পরিবর্তন হয়। কিন্তু রোজা শেষে, ঈদের দিন থেকে তা আবার পাল্টে যাবে। তাই এই সময়ে প্রথমেই মনে রাখতে হবে কখন কোন খাবারটা ঠিক কি পরিমাণ খাওয়া দরকার। নয়ত হঠাৎ করে খুব আয়োজন করে পরিমাণের অধিক খাবার দ্রুত অসুস্থ হওয়ার কারণ হতে পারে।
ঈদে সুস্থ থাকার উপায়
আসুন ঈদের দিন নিজেকে সুস্থ রাখতে জেনে নেই সহজ ও কার্যকরী ৫টি উপায়-
১. অল্প খান এবং বিরতি দিয়ে খান
ঈদে সুস্থ থাকার জন্য চাই পরিমিত ও নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ। ঈদ আনন্দে হঠাৎ করে একবারে না খেয়ে বিরতি দিয়ে অল্প অল্প খাওয়া ভালো। খাবারের পরিমাণের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাটা খুবই জরুরী। পেট পুরে খাওয়া মানসিক তৃপ্তি দিতে পারে বটে কিন্তু শরীরের জন্য তা হতে পারে ভয়ঙ্কর।
ঈদের সময় তৈলাক্ত খাবার, পোলাও, বিরিয়ানি এবং আমিষজাতীয় খাবার যেমন মুরগি, খাসি বা গরুর মাংস, কাবাব, রেজালা ইত্যাদি খাওয়া হয়। তাই খাদ্য তালিকায় তেল, চর্বি, মশলার সমন্বয়ে তৈরি খাবারের পাশাপাশি যেন কিছু হালকা ধরনের স্বাস্থ্যসম্মত খাবারও যেন থাকে, সেদিকে নজর দেয়া জরুরি। যেমন নানারকম ফলের তৈরি সালাদ, কাস্টার্ড, হাড় ছাড়া মুরগির মাংস ও নানারকম সবজি রান্না। কেননা প্রচলিত রান্নার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত সহজপাচ্য খাবার থাকলে একদিকে যেমন রুচি বদলিয়ে খাওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি পরিবারের কেউ অসুস্থ থাকলে সেও স্বাচ্ছন্দ্যে খেয়ে সুস্থ থাকতে পারবে।
২. সঠিক উপায়ে মাংস রান্না করুন
যত কিছুই বলা হোক, ঈদে মাংস খাওয়া হবে না তা কি হয়? একটি নির্দিষ্ট সময়ে এক মাস খাওয়ার পরে, দেহ সেই নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে যায়। হঠাৎ অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে পেটে জ্বালাপোড়া, ব্যথা এবং বদহজম হতে পারে। তাই গরু বা খাসির মাংস রান্নায় যতটুকু সম্ভব, চর্বি এড়িয়ে চলতে হবে। দেশি মুরগি কেনার চেষ্টা করতে হবে এবং চামড়া বাদ দিয়ে রান্না করতে হবে। মাংস রান্নার আগে গরম পানিতে ফুটিয়ে নেয়া যেতে পারে, যাতে করে চর্বি আলাদা হয়ে আসে। মাংস রান্নার সময় মাংসের সাথে সবজি যোগ করা যেতে পারে যা মাংস হজমে সহায়তা করবে, সেই সঙ্গে খাবারটি স্বাস্থ্যকরও হবে।
মাংসে টেস্টিং সল্ট, সস এসব উপকরণ ক্ষতিকর দিকটা আরো বাড়িয়ে দেয়, তাই এই ধরনের উপকরণ পরিহার করাই ভালো। ঈদের মাংস রান্নায় তেল একটু বেশি ব্যবহার হবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই তবে তেলটাকেই স্বাস্থ্যকর করে তোলার জন্য রাইস ব্র্যান অয়েল বা অলিভ অয়েল ব্যবহার করা ঘি বা সয়াবিন তেলের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।
৩. মিষ্টি জাতীয় খাবার যথা সম্ভব এড়িয়ে চলুন
ঈদের দিন মিষ্টি কিছু না খেলে চলে! ঈদের দিন সকাল বেলা সব বাড়িতেই মিষ্টি খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তবে ঈদের দিনে মিষ্টি খাওয়ার এই রেওয়াজ যতদূর সম্ভব সীমিত রাখাই ভালো। যাদের ডায়াবেটিস আছে, ওজন বেশি কিংবা ওজন বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের মিষ্টি না খাওয়াই ভালো। মিষ্টি খাবারে চিনির বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পার যা ক্যালোরির পরিমাণ কমাবে। এছাড়া আম, কলা, আঙুরের মতো মিষ্টি ফল ব্যবহার করেও খাবারে মিষ্টত্ব আনতে পারেন প্রাকৃতিকভাবেই।
মনে রাখতে হবে, প্রলোভন যখন দরজায় কড়া নাড়ায়, তখন এটি মোকাবেলার জন্য স্মার্ট উপায়গুলি অবলম্বন করুন এতে পরবর্তীতে আপনার সিদ্ধান্তের জন্য আপনার শরীর আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।
৪. ঘরেই তৈরি করুন পানীয়, কোলা বা সফট ড্রিঙ্কস বর্জন করুন
কোমল পানীয় বা কেনা ফলের রসের বদলে বাড়িতেই বানানো যায় বোরহানি, লাবাং, দইয়ের শরবত বা তাজা ফলের জুস। ভারী খাবার হজমের অজুহাতে খাবারের সাথে কোমল পানীয় পান করার ধারণা দুর্দান্ত বলে মনে হলেও বাস্তবে তা উল্টো। কেন না কোমল পানীয়তে অতিরিক্ত চিনির কারণে খেতে সুস্বাদু হলেও তা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাছাড়া এই সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান না করায় কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রচুর পরিমাণে পানি, শরবত, ফলের রস ইসবগুলের ভুসি ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি পান করা উচিত।
৫. খাদ্য তালিকায় রাখুন ফ্যাট প্রশমিত করে এইরকম খাবার
সবশেষে বাজারের তালিকাতেও রাখতে হবে যেসব খাবার ফ্যাট কমায়। তাতে করে ঈদের ভারি খাবার সুস্বাস্থ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। ঈদের দিনে সালাদ খাওয়ায় কার্পণ্য করা যাবে না। বরং অন্য খাবার কমিয়ে দিয়ে সালাদ খেয়ে পেটটা ভরে তোলার চেষ্টা করতে হবে। সালাদ হিসেবে খাওয়া যেতে পারে শসা, টমেটো, পেঁয়াজ, লেবু, কাঁচা মরিচ ও লেটুস। গাজর ও লেটুসে রয়েছে প্রচুর বিটা ক্যারোটিন যা থেকে ভিটামিন এ তৈরি হয়, টমেটোতে রয়েছে লাইকোপেন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, এবং লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা শারীরিক সু-স্বাস্থ্যের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
খাবারের সঙ্গে সালাদ খাওয়ার সময় চেষ্টা করতে হবে সব সময় টাটকা অবস্থায় খাওয়ার। খাবারের শেষ পাতে টক দই, খাবার খাওয়ার পর চিনি ছাড়া লেবুর শরবত বা গ্রিন টি, সেই সঙ্গে প্রচুর পানি পান করতে হবে। এগুলো ভারী খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে।
শেষকথা
ঈদের সময়ে যত রকমারি খাবারই থাকুক না কেন, খেতে হবে নিজের শরীরের কথা চিন্তা করে। খাবার হতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত, সহজপাচ্য ও পরিমিত। পরিবেশিত হবে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নভাবে। সেই সাথে নিয়মিত হাঁটাচলা এবং ব্যায়ামের করতে হবে। ঘরের বাহিরে যাওয়া সম্ভব না হলে ঘরের ছাদে বা বারান্দায় নিয়মিত হাটা চলা করলে শরীরে ও মনে ইতিবাচক প্রভাব পরবে এবং ঈদে মাটনের সাথে মটন বিরিয়ানি বা শাহী কোরমার সেই অতিরিক্ত এক প্লেটের অপরাধবোধ হ্রাস করতে সহায়তা করবে ।
প্রিয়জনের সাথে এই উৎসব হোক সম্পূর্ণরূপে উপভোগ্য, কাটুক সু-স্বাস্থ্যে।
আরও পড়ুনঃ
