পেটের মেদ বাড়ছে যে ১১টি কারণে

পেটের চর্বি দিন দিন বেড়েই চলছে? কিন্তু আপনি টেরই পাচ্ছেন না পেটের মেদ কিভাবে বাড়ছে! আর তাই পেটের ভুঁড়ি কমানোর আগে আপনাকে জানতে হবে কি কারণে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমান সময়ে পেটের চর্বি নিয়ে অস্বস্তি কিংবা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ছোট ছোট কিছু ভুল কিংবা বদ অভ্যাসের কারণে চর্বি যদি একবার বেড়েই যায় তা আর কমবে না এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেকেরই ধারণা ফ্যাট জাতীয় খাবার বেশি খেলে কিংবা খাবার বেশি গ্রহণের ফলেই চর্বি বাড়ে আসলেই কি তাই! পেটের ভুঁড়ি কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটা যদি নাই জানেন তবে এর সমাধান করবেন কিভাবে? তাই চলুন জেনে নেই আপনার পেটের মেদ কি কারণে বাড়ছে।

পেটের ভুঁড়ি কেন বৃদ্ধি পায়?

পেটের চর্বি বৃদ্ধির জন্য সাধারণত কিছু কমন কারণ রয়েছে তবে সেটা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ  সবার ঠিক একই কারণে চর্বি বাড়ে না। আসলে-

  • বয়স,

  • লিঙ্গ,

  • খাদ্যাভাস,

  • শারীরিক পরিশ্রমের ধরণ,

  • মানসিক চাপ,

  • লাইফস্টাইল 

উপরোক্ত ব্যাপারগুলি যেমন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয় তেমনি পেটের চর্বি বৃদ্ধির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন কারণ দায়ী। আসুন পেটের মেদ বৃদ্ধির কারণগুলি বিস্তারিত জেনে নেই-

১. চিনিযুক্ত খাবার এবং কোমল পানীয় 

আমাদের রোজকার ডায়েটে সাধারণ যে খাবারগুলিতে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে তার মধ্যে রয়েছে-

  • বেকারি আইটেম বা বেকড পণ্য (কেক, ব্রেড, পেস্ট্রি, পেটিস, বিস্কুট ইত্যাদি),

  • সিরিয়াল জাতীয় খাবার,

  • প্যাকেটজাত খাবার,

  • কোমল পানীয়,

  • এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাবার।

সাধারণত সহজলভ্য হওয়ার কারণে কোমল পানীয় বেশি ব্যবহৃত হয়ে থকে। এছাড়াও এগুলো পরিমাণে বেশি গ্রহণ করা যায় এবং ন্যূনতম প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজন হয়। খেয়াল করলে দেখবেন যে আপনি এসব পানীয়ের মাধ্যমে একবারে  প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি ও চিনি গ্রহণ করে ফেলছেন অথচ এর মধ্যে খুবই নগণ্য পরিমাণ পুষ্টি থাকে অথবা অনেক সময় কোন পুষ্টিই থাকে না। ফলে আপনি দিনে দিনেই অত্যধিক ক্যালোরি গ্রহণ করছেন এবং শেষ পর্যন্ত তা অতিরিক্ত ফ্যাট হিসেবে জমা হয়।

চিনি যুক্ত খাবার খাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এই খাবার খাওয়ার পরেই আপনার আবার এই ধরণের  খাবার খাওয়ার জন্য ক্রেভিং বা আকাঙ্খা তৈরি হবে। ফলে দেখা যাবে যে আপনার বারবার একই খাবার খাওয়ার  প্রবণতা তৈরি হচ্ছে যার ফলে এই অতিরিক্ত ক্যালোরি পেটের চারপাশে মেদ হিসেবে জমা হচ্ছে। 

২. ট্রান্স ফ্যাট

ট্রান্স ফ্যাট হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর এবং ক্ষতিকর ফ্যাটগুলির মধ্যে একটি। যদিও স্বল্প পরিমাণে ট্রান্স ফ্যাট প্রকৃতিতে দেখা যায়, তবে কৃত্তিম ভাবে প্রচুর খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট যুক্ত করা হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রান্স ফ্যাটগুলি সাধারণত বেকড পণ্য এবং প্যাকেটজাত  খাবারে  সহজেই পাওয়া যায়। এই ট্রান্স ফ্যাট পেটের মেদ বৃদ্ধিতে অসীম ভূমিকা রাখে। এছাড়াও কৃত্রিম ট্রান্স ফ্যাট  ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স,  হৃদরোগ এবং বিভিন্ন  ধরণের ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

৩. শারীরিক পরিশ্রম না করা

অলস জীবন যাপন করা, শারীরিক পরিশ্রম না করা কিংবা ব্যায়াম না করা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা যেমন, টিভি দেখা, কাজের ডেস্কে বসা, দীর্ঘ যাত্রা, ভিডিও গেম খেলা ইত্যাদি কারণে খুব সহজেই মেদ বেড়ে যেতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল মানুষ শারীরিক পরিশ্রম কম করেন কিংবা ব্যায়াম করেন না তাদের খাবার গ্রহণের পর ক্যালোরি খরচ একদমই হয় না কিংবা খুবই কম হয়। ফলশ্রুতিতে অতিরিক্ত ক্যালোরি পেটে চর্বি হিসেবে জমা হয়।

ফিজিক্যালি কম অ্যক্টিভ থাকা এবং আলস জীবন যাপন উভয়ই  পেটের চর্বি বৃদ্ধির সাথে সরাসরি জড়িত। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যারা প্রতিদিন 8 ঘন্টার বেশি বসে থাকেন (ঘুমানোর সময় বাদে)  তাদের স্থূলতার ঝুঁকি ৬২% বেড়ে যায়।

৪. মহিলাদের মেনোপজ

নারীদের পিরিয়ড স্থায়ীভাবে বন্ধের ১২ মাস পর থেকে মেনোপজ শুরু হয়। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর, কখনও কখনও ৪০-৪২ বছর বয়স হতেও নারীদের পিরিয়ড বন্ধ হয়ে আসার ঘটনা ঘটে থাকে। মেনোপজের  সময় পেটের চর্বি হওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার ।

বয়ঃসন্ধিকালে ইস্ট্রোজেন হরমোনের  প্রভাবে গর্ভাবস্থার প্রস্তুতির জন্য নিতম্ব এবং উরুতে চর্বি জমা হতে শুরু করে। ত্বকের নিচের চর্বি স্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিকারক নয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে এটি কমানো কঠিন হতে পারে। একজন মহিলার শেষ মাসিক হওয়ার এক বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে মেনোপজ হয়। এই সময়ে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। সাধারণভাবে এই সময়  নিতম্বের পরিবর্তে পেটে চর্বি জমা হওয়ার প্রবণতা বেশি। যদিও মেনোপজ সম্পূর্নই বার্ধক্যে পরিণত হওয়ার  প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ।

৫. অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া

শত শত ধরণের ব্যাকটেরিয়া মানুষের অন্ত্রে বাস করে, প্রধানত কোলনে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলির মধ্যে কিছু আপনার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, তবে অন্যরা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া সমষ্টিগতভাবে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম নামে পরিচিত। স্বাস্থ্যকর ইমিউন সিস্টেম বজায় রাখতে এবং রোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য অন্ত্রের স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

কিছু গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার অস্বাস্থ্যকর ভারসাম্য পেটের চর্বি সহ ওজন বাড়াতে পারে। এটা মনে করা হয় যে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্যের পরিবর্তনের ফলে শক্তি এবং পুষ্টির বিপাকের পরিবর্তন হতে পারে, এবং হরমোনের কার্য়কলাপও পরিবর্তন হতে পারে, যার ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়। তবে এই বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

৬. মানসিক চাপ

কর্টিসল এমন একটি হরমোন যা আপনার বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। এটি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি দ্বারা উৎপাদিত হয় এবং "স্ট্রেস হরমোন" হিসাবে পরিচিত কারণ এটি শরীরকে শারীরিক বা মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করে। বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ মানুষই স্ট্রেসে থাকে নানা কারনে।

দুর্ভাগ্যবশত, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের ফলে মেদ  জমে যেতে পারে এবং কমানো কঠিন হয়ে পরে কারণ স্ট্রেস অতিরিক্ত পরিমাণে কর্টিসলের উৎপাদন বাড়ায়। অধিকন্তু, মানুষ যখন স্ট্রেসে থাকে  তখন  কেউ কেউ আরামের জন্য উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করে কেননা তখন কর্টিসেল হরমোন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা অবাঞ্ছিত ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী।

উপরন্তু দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ আপনার লাইফস্টাইলকে প্রভাবিত করতে পারে  যেমন ঘুমে ব্যাঘাত ঘটা, অলস জীবন যাপন ওজন বৃদ্ধি তথা পেটের অতিরিক্ত মেদ বৃদ্ধির জন্য দায়ী। 

৭. নিম্ন ফাইবার যুক্ত খাদ্য

ফাইবার আপনার সর্বোত্তম স্বাস্থ্য এবং ওজন ব্যবস্থাপনার জন্য অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ধরণের ফাইবার দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে, ক্ষুধার হরমোনগুলিকে স্থিতিশীল করতে এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

১১১৪ জন পুরুষ এবং মহিলাদের নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত এবং পরিমিত পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ করতো তাদের মেদ অন্যদের তুলনায় কম। নিম্ন ফাইবারযুক্ত খাবারগুলি পেটের চর্বি বৃদ্ধি, ক্ষুধা এবং ওজন বৃদ্ধির সাথে জড়িত বলে মনে করা হয়। 

২৮৫৪ জন প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার গোটা শস্য পেটের চর্বি হ্রাসের সাথে যুক্ত। উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে মটরশুটি, মসুর ডাল, ওটস, সবজি, ফল, বাদাম,বীজ ইত্যাদি।

৮. ধূমপান

গবেষকরা ধূমপানকে পেটের চর্বি বৃদ্ধির সরাসরি কারণ হিসাবে বিবেচনা করেন না তবে তারা এটিকে ঝুঁকির কারণ বলে মনে করেন।

৯. জেনেটিক কারণ

জেনেটিক কারণে অনেকের পেটের চর্বি বেড়ে যেতে পারে। বাবা মায়ের কারো মেদ বেশি থাকলে সন্তানের মেদ বেশি হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যায়।

১০. কম প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ 

খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহন ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। প্রানিজ প্রোটিন  ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে কারণ অন্যান্য ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টের তুলনায় এই প্রোটিন হজম হতে বেশি সময় নেয়। প্রোটিন দেহ গঠন এবং বৃদ্ধিতেও সহায়তা  করে, যার ফলে খাদ্যের বিপাক ভালো হয় এবং বিশ্রামের সময় বেশি ক্যালোরি বার্ন করতে অবদান রাখে। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা প্রোটিন পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করেন তাদের পেটের চর্বি কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

১১. পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া

পর্যাপ্ত ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক গবেষণায় ওজন বৃদ্ধির সাথে অপর্যাপ্ত ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রমান পাওয়া গেছে যার মধ্যে পেটের মেদ বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত।

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে দেহে এনার্জির ঘাটতি দেখা দেয় এই অভাব পূরণের জন্য খাদ্য গ্রহণের পরিমান  বৃদ্ধি পায়, ক্লান্তি বেড়ে যায় এবং শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষমতা কমে যাওয়ার দরুন অলস জীবন যাপনের প্রবণতাও বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে পেটের চর্বি বেড়ে যায়।

যারা রাতে পর্যাপ্ত ভালো ঘুমান না  স্বাভাবিকভাবে তাদের  অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার  প্রবণতা তৈরী হয় ফলে পেটের চর্বি বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পরিশেষে

কথায় আছে স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। আর পেটের ভুঁড়ি যদি অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তেই থাকে তবে তা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তাই মারাত্নক ঝুঁকিতে পড়ার আগে পেটের মেদ কেন বাড়ছে সে বিষয়ে সতর্ক হন এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

 

আরও পড়ুনঃ

পেটের মেদ কমানোর ১৩টি সহজ উপায়

Default user image

মুশফিক জাহান, লেখক, আস্থা লাইফ

পড়াশোনা করছি গভার্নমেন্ট কলেজ অফ এপ্লাইড হিউম্যান সাইন্সে খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান নিয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি পুষ্টি নিয়ে টুকটাক লেখালেখি করি মূলত জনগনের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এছাড়াও বিভিন্ন সেবামূলক সংগঠনের সাথে যুক্ত আছি। অবসর সময়ে গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি।

Related Articles